‘বালুর নেশায় চলে গুলি, পদ্মার চরে ৯ মাসে সাত খুন!’ ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’ দিয়েও থামানো যাচ্ছে না কুখ্যাত কাঁকন বাহিনীকে
দেশের সীমান্ত ঘেঁষা পদ্মার চরাঞ্চলে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং কোটি কোটি টাকার গুপ্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একাধিক সুসংগঠিত সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে এক নজিরবিহীন ও নৃশংস রক্তগঙ্গা বইছে। চরের বালুমহাল একক নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রতিনিয়ত দেদারসে ছিটানো হচ্ছে বুলেট, যার নির্মম বলী হয়ে গত ৯ মাসে পদ্মার চরে অন্তত ৭ ব্যক্তির লাশ পড়েছে। নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা, পাবনার ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমানায় বিস্তৃত পদ্মার চরে বছরের পর বছর ধরে একাধিক সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনী এই খুনের রাজনীতি টিকিয়ে রেখেছে। সবশেষ গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) লালপুর উপজেলার রাইটার চর এলাকার পদ্মা নদী থেকে সাহাবুল ইসলাম (৪৫) নামের এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত সাহাবুল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা। লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম জানান, ভোরের দিকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে একদল দুর্বৃত্ত বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে সাহাবুলকে হত্যা করে এবং এই ঘটনায় এক মৎস্যজীবীও গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয় কৃষকদের মতে, কুখ্যাত ‘কাঁকন বাহিনী’ ও তাদের প্রতিপক্ষ দলগুলোর মধ্যকার এই আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত বর্তমানে চরজাজিরা ও রাইটার চর এলাকায় চরম উত্তেজনা তৈরি করেছে।অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু করে চলতি বছরের জুন মাসের এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২০২৬ সালের এই ছয় মাসেই ঘটেছে চারটি রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড এবং বাকি তিনটি ঘটেছে ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে। পুলিশি তথ্য ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, পদ্মা চরের একচ্ছত্র শাসন ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অত্যাচার চালাতে বর্তমানে মাঠে সক্রিয় রয়েছে ১১টি পুলিশ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এদের মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত হচ্ছে ‘কাঁকন বাহিনী’। এছাড়া মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী চরের বুকে রীতিমতো রাজত্ব চালাচ্ছে। বিগত ২৫ সালের ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের চৌদ্দহাজার চরে খড় কাটার আড়ালে কাঁকন বাহিনীর সাথে অন্য বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে আমান মন্ডল ও নাজমুল হোসেন নামের দুই ব্যক্তি নিহত হন এবং এর পরদিনই হবিরচর থেকে লিটন হোসেন নামের আরেক কাঁকন বাহিনী সদস্যের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি রাজশাহীর বাঘার চরে সোহেল রানাকে বাড়ির ভেতর ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ১৮ মে কালিদাসখালী চরে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন স্বপন বেপারী, যার লাশটি ট্রলারে করে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। সবশেষ ৯ জুন চর জাজিরায় ভাসমান স্পিডবোটের ভেতর থেকে আজিজুল হাকিম নামের এক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।পদ্মার এই বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ভারতের সীমান্তবর্তী হওয়ায় সন্ত্রাসীরা খুব সহজেই অবৈধ পথে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র আমদানি করে এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদিকে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চরে বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করেছে। গত ১৮ মে-র হত্যাকাণ্ডের পর লালপুর, বাঘা, ঈশ্বরদী ও দৌলতপুর অংশে যৌথ অভিযানে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ কার্তুজ, দেশীয় অস্ত্র, স্পিডবোট এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১৭ জুলাই সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের দিনভর এক মেগা অভিযানে কাঁকন বাহিনীর আস্তানা থেকে ৩টি পিস্তল, ৪৮টি গুলি, মানুষের মাথার খুলি এবং নগদ ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল। বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক জানিয়েছেন, পুলিশ চরের সন্ত্রাস দমনে ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’ নামের একটি বিশেষ মেগা অভিযান শুরু করেছে, যার আওতায় কয়েক দফায় ইতিমধ্যে ২০৩ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।পদ্মা চরের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের গোড়াপত্তন ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগে ‘পান্না বাহিনী’ ও ‘কাঁকন বাহিনী’র হাত ধরে, যাদের মধ্যকার পারস্পরিক লড়াইয়ে অতীতে অন্তত ৪১ জন খুন হয়েছিল। ২০০৫ সালে পান্না বাহিনী প্রধান ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর এবং পরবর্তীতে প্রতিপক্ষ লালচাঁনসহ ২৫ জন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলে কিছুদিন শান্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু পান্নার ওস্তাদ হাসানুজ্জামান কাঁকন ওরফে ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন (যার পৈতৃক নিবাস কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হলেও বর্তমানে ঈশ্বরদীতে থাকেন) বিদেশ থেকে ফিরে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রয়ে পুনরায় এই বালুমহাল ও সন্ত্রাসী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। বর্তমানে তাঁর বাহিনীর চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও জমি দখলের তাণ্ডবে চার উপজেলার মানুষ সম্পূর্ণ জিম্মি। যদিও অভিযুক্ত বাহিনী প্রধান কাঁকন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগকে মিথ্যা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন এবং উল্টো অভিযোগ তুলেছেন যে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে তাঁদের লোকজনের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে এবং পুলিশ তাঁদের মামলা নিচ্ছে না। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্ডকার মো. শামীম হোসেন জানিয়েছেন, পদ্মা চরের এই খুনোখুনি বন্ধ করতে এবং জনমানবহীন চরে গুলি চালিয়ে সন্ত্রাসীদের আত্মগোপন করার প্রবণতা রুখতে খুলনা রেঞ্জের সাথে বিশেষ বৈঠক করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের গোড়া উপাটনে সর্বোচ্চ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বেঙ্গলি জার্নালের বিশেষ ক্রাইম ডেস্ক, বর্ডার উইং ও ইনভেস্টিগেশন সেল পদ্মার চরে ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’-এর পরবর্তী অগ্রগতি এবং কাঁকন বাহিনীর শীর্ষ অস্ত্রধারীদের গ্রেফতারের সার্বিক গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিমুহূর্তে অনুসন্ধান করছে