ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনোর আশঙ্কা
বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন ও প্রলয়ঙ্কারী বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিয়ে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে আবারও শুরু হয়েছে জলবায়ুগত মহা-সংকট ‘এল নিনো’। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) নতুন এই এল নিনোর সূচনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের গভীর আশঙ্কা ও গাণিতিক পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো অতীতের সব ঐতিহাসিক রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে, যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একযোগে ভয়াবহ বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি খরা, স্মরণকালের তীব্রতম তাপপ্রবাহ, বিধ্বংসী দাবানল ও তীব্র খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হবে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের এল নিনো যদি তার সর্বোচ্চ শক্তি অর্জন করে, তবে এটি গত ৭৫ বছরের মানব ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক এল নিনো হিসেবে রেকর্ড গড়বে। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল অংশে খরা ও বন্যা পরিস্থিতি আরও চরম রূপ নেবে।শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা গভীর সমুদ্রে লক্ষ্য করেছিলেন যে, কয়েক বছর পরপর বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে আকস্মিকভাবে ‘অ্যাঙ্কোভি’ মাছের আনাগোনা একবারে কমে যায়। স্প্যানিশ ভাষায় এই রহস্যময় ঘটনাকে তারা ‘এল নিনো’ বা ‘শিশু যিশু’ নামে অভিহিত করেন। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি অত্যন্ত জটিল বৈশ্বিক জলবায়ুগত চক্র। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত শক্তিশালী বায়ুর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে এর সৃষ্টি হয়, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাকে স্বাভাবিকের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং পুরো বিশ্বের বায়ুমণ্ডলের ধরনকে ওলটপালট করে দেয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পেলে সেটিকে ‘শক্তισηালী এল নিনো’ ধরা হয়। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের সাম্প্রতিকতম পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ওপরে উঠে যেতে পারে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক।বিজ্ঞানীদের নথি অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো আঘাত হেনেছিল ১৯৮২-৮৩ সালে, যখন সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবারের এল নিনো সেই আদি রেকর্ডকেও সহজে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন যে, এল নিনো নিজে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না, তবে মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে যখন এটি মিলিত হয়, তখন এর প্রভাব আরও শতগুণ তীব্র হয়ে ওঠে। অতীতে দেখা গেছে, ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালে তৈরি হয়েছিল নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড। বর্তমানে ২০২৪ সাল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে বিশ্ব রেকর্ডধারী, যে বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। তবে ভয়াবহ জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, এই এল নিনোর সর্বগ্রাসী প্রভাবে আগামী ২০২৭ সাল বিশ্ববাসীকে আরও তপ্ত ও উষ্ণতম এক বৈশ্বিক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে।এল নিনোর এই বিধ্বংসী প্রভাব পৃথিবীর সব অঞ্চলে এক রকম হয় না; এটি কোথাও বয়ে আনে খাঁ খাঁ করা খরা, আবার কোথাও ডেকে আনে অতিবৃষ্টি ও প্রলয়ঙ্কারী বন্যা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত ৯ জুন এক বৈশ্বিক সতর্কবার্তায় বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি খাদ্য ও জীবনযাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর ধাক্কায় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ও হাহাকারপূর্ণ খরা দেখা গিয়েছিল। এফএওর মতে, সোমালিয়ায় আগামী অক্টোবর পর্যন্ত এই খরা চলতে পারে এবং এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত শুরু হতে পারে ভারী ও অবিরাম বৃষ্টিপাত। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ খরার পর এই আকস্মিক অতিবৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলবে, কারণ দীর্ঘদিন শুকিয়ে থাকা শক্ত মাটি বৃষ্টির পানি সহজে শোষণ করতে পারে না, যার ফলে নিমেষেই তৈরি হয় আকস্মিক ও প্রাণঘাতী বন্যা। মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চলসহ এশিয়ার বিভিন্ন জনবহুল এলাকাও এখন তীব্র খরার ঝুঁকিতে ধুঁকছে।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের অনেক অঞ্চল এরই মধ্যে যুদ্ধ, চরম খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের মধ্যে দিন কাটিয়েছে, যার ওপর এই শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান ভূpolitical সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে বিশ্বব্যাপী রাসায়নিক সার সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ইউরোপীয় কমিশন ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও হাইতির মতো যুদ্ধবিক্ষুব্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো এই এল নিনোর ফলে এক চরম ও ঐতিহাসিক মানবিক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব না হলেও সঠিক বৈজ্ঞানিক ও আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য খরাসহিষ্ণু ফসলের বীজ ব্যবহার, গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক স্তরে দ্রুত খাদ্য সহায়তা তহবিল গঠন করা এখনই জরুরি।