ইউনুস সরকারের ১ বছরে শুধুমাত্র সেবা খাত থেকেই ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে: টিআইবি
দেশজুড়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যবিরোধী সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দেশের সেবাখাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা পূর্বের তুলনায় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সর্বশেষ জাতীয় খানা জরিপে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক চিত্র। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এসে সেবাখাতে দুর্নীতির কারণে দেশজুড়ে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের প্রায় ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমান। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ এর এই বিস্ফোরক ফল প্রকাশ করা হয়। টিআইবি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে ভয়াবহ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা আওয়ামী লীগ আমলের ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, বিগত সরকারের আমলের তুলনায় বর্তমান সময়ে দুর্নীতির গ্রাস আরও তীব্র হয়েছে।সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সেবাখাতে ঘুষের ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যারা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের সিংহভাগই জানিয়েছেন যে ঘুষ না দিলে কোনো সরকারি সেবা পাওয়া যায় না। ঘুষকে বর্তমানে একটি অলিখিত বাস্তবতায় পরিণত করা হয়েছে। ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো হওয়া সত্ত্বেও আমরা সেই ডিজিটাল সেবার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারিনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সেবা খাতের এই দুর্নীতি চরম বৈষম্যমূলক; যারা ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন, তারা লাভবান হন আর আমজনতা বঞ্চিত হন। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষের ওপর দুর্নীতির এই অন্যায্য বোঝা অনেক বেশি। এছাড়া নারী, আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার মূল ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক।দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চরম অকার্যকারিতা ও জনগণের আস্থার তীব্র সংকট নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক এক হাত দেখে নেন। তিনি বলেন, শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকায় দেশে দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাত্র ০ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ দুদকে অভিযোগ করেছেন, যা প্রমাণ করে যে দুদকের ওপর মানুষের আস্থা এখনো তৈরি হয়নি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বিগত তিন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে কোনো কমিশন না থাকায় দুদক বর্তমানে বাস্তবে সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে। টিআইবি অবিলম্বে সার্চ কমিটির কার্যক্রম সম্পন্ন করে স্বাধীন, দক্ষ, সৎ এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করতে পারেন—এমন যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে দুদক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র গবেষক দল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে ১০ দফা সুপারিশ পেশ করেন।৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সুশাসনের দাবির মুখে টিআইবির এই অকাট্য ও তুলনামূলক ডাটা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এক নজিরবিহীন তোলপাড় ও ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। বেঙ্গলি জার্নালের বিশেষ জাতীয় ডেস্ক, ক্রাইম সিন উইং ও পলিটিক্যাল সেল টিআইবির এই রিপোর্টের পর সরকারের নীতিগত অবস্থান, দুদক পুনর্গঠনে সার্চ কমিটির সর্বশেষ তৎপরতা এবং সেবাখাতগুলোর দুর্নীতি বন্ধে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের প্রতিমুহূর্তের খবরাখবর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিমুহূর্তে অনুসন্ধান করছে।