ঢাকা    রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩
Bengali Journal

মতামত

শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মান কোথায়?

শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মান কোথায়?

শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মান কোথায়?

সনদ নির্ভর বাংলাদেশ, দক্ষতাহীন প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সংকট

একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল তার অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত কতটা শক্ত, নতুন প্রজন্ম কতটা জ্ঞানসম্পন্ন এবং সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সক্ষমতা কতটুকু—তার ওপর। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সনদ অর্জনকারী মানুষের সংখ্যা বাড়াচ্ছি?

বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু শিক্ষার মান, মৌলিক দক্ষতা, চিন্তাশক্তি ও বাস্তবজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS), BBS ও UNICEF-এর যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠ-বোঝার দক্ষতা রয়েছে; মৌলিক গণিত দক্ষতা রয়েছে মাত্র ৩৯.২ শতাংশের। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, শ্রেণি পরিবর্তন করছে, পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে—কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি জরিপের ফল নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষা কি পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফল, জিপিএ, মেধাতালিকা ও সনদকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য—জিজ্ঞাসা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা—অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী কী শিখল, কতটা বুঝল, বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাতে পারবে, এসব প্রশ্নের চেয়ে পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, সেটিই যেন বড় হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিংনির্ভরতা, গাইডবইয়ের বাজার এবং মুখস্থবিদ্যার প্রবণতা। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ্যবই বোঝার চেয়ে পরীক্ষায় সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করছে, কিন্তু নিজের ভাষায় একটি বিষয় ব্যাখ্যা করতে, নতুন কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে কিংবা বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে।

শিক্ষক সংকট ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা

শিক্ষার মান উন্নয়নের আলোচনায় শিক্ষককে কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখতে হবে। একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল শিক্ষকই শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ তৈরি করতে পারেন। কিন্তু শিক্ষকস্বল্পতা, নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের পরিবেশকে দুর্বল করছে।

২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকপদ শূন্য থাকার তথ্য উঠে এসেছে। গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ও ব্যবহারিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের দায়িত্ব নিতে হলে কিংবা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ ছাড়া পাঠদান করতে হলে তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে।

শিক্ষককে কেবল নিয়োগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, যথাযথ মূল্যায়ন এবং পেশাগত স্বাধীনতা। একই সঙ্গে শিক্ষকতার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষা যখন আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তখনই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন ধনী ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান সমান সুযোগ পায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য শিক্ষার মান ও সুযোগ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। শহরের সচ্ছল পরিবারের সন্তান উন্নত বিদ্যালয়, কোচিং, প্রযুক্তি ও অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা পাচ্ছে; অন্যদিকে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু প্রয়োজনীয় বই, পুষ্টি, প্রযুক্তি কিংবা মানসম্মত শিক্ষকের সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে উত্তরণের পথে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও শিক্ষাসমাপ্তির হার কমে যাওয়ার তথ্যও উদ্বেগজনক। UNICEF-এর MICS 2025 অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক বয়সী শিশুদের ৩৩.৯ শতাংশ বিদ্যালয়ের বাইরে। অর্থনৈতিক চাপ, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষার ব্যয়—সব মিলিয়ে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাচ্ছে।

শিক্ষা যদি পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা সামাজিক বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে বৈষম্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের দক্ষতা কোথায়?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের প্রয়োজনের দূরত্ব। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত, উৎপাদনব্যবস্থা, গবেষণা, ব্যবস্থাপনা কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শিল্প ও উৎপাদন খাতের বাস্তবতা বলছে, শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে আধুনিক কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা কঠিন। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, তথ্য বিশ্লেষণ, যোগাযোগক্ষমতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা। অথচ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে এখনো অনেক পরিবার সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কম মর্যাদার চোখে দেখে। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী, মেশিন অপারেটর, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ কিংবা উৎপাদন ব্যবস্থাপনা কর্মী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। ডিগ্রির মর্যাদার পাশাপাশি দক্ষতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

বাজেট বাড়লেই কি শিক্ষার মান বাড়বে?

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করার কথা জানানো হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ। বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কতটা পরিকল্পিতভাবে ব্যয় হবে এবং তার সুফল শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না।

শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যসামগ্রীর মান, গবেষণা, প্রযুক্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু বাজেটের অঙ্ক বড় হলেই শিক্ষার সংকট দূর হবে না; অর্থের কার্যকর ব্যবহারই হবে আসল পরীক্ষা।

কেমন হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা বারবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রাথমিক স্তরে বাংলা পাঠ-বোঝা, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার মূল্যায়ন চালু করতে হবে।

চতুর্থত, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো শিশু অর্থনৈতিক বা সামাজিক কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে। পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। ষষ্ঠত, শিক্ষা নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক কাঠামো যেন রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত না হয়।

শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসম্পন্ন পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নয়; এটি একজন মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক, মানবিক ব্যক্তি ও যুক্তিবাদী চিন্তক হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।

শেষ কথা

বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা শিল্পকারখানা দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটায়; কিন্তু সেই উন্নয়নকে টেকসই করে দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ। একটি প্রজন্ম যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি, প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়বে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়, মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ দেওয়া নয়, যোগ্যতা তৈরি করা। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাঠানো নয়, নিশ্চিত করা—প্রতিটি শিশু যেন বিদ্যালয় থেকে সত্যিকার অর্থে শিখে বের হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে চাই, নাকি জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের গতিপথ।

ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। 

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মান কোথায়?

প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মান কোথায়?

সনদ নির্ভর বাংলাদেশ, দক্ষতাহীন প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সংকট


একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল তার অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার ভিত কতটা শক্ত, নতুন প্রজন্ম কতটা জ্ঞানসম্পন্ন এবং সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সক্ষমতা কতটুকু—তার ওপর। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত প্রজন্ম তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সনদ অর্জনকারী মানুষের সংখ্যা বাড়াচ্ছি?

বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু শিক্ষার মান, মৌলিক দক্ষতা, চিন্তাশক্তি ও বাস্তবজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS), BBS ও UNICEF-এর যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০.২ শতাংশের মৌলিক পাঠ-বোঝার দক্ষতা রয়েছে; মৌলিক গণিত দক্ষতা রয়েছে মাত্র ৩৯.২ শতাংশের। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক শিশু বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, শ্রেণি পরিবর্তন করছে, পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে—কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি জরিপের ফল নয়, এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষা কি পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ?

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার ফলাফল, জিপিএ, মেধাতালিকা ও সনদকে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য—জিজ্ঞাসা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা—অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী কী শিখল, কতটা বুঝল, বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাতে পারবে, এসব প্রশ্নের চেয়ে পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, সেটিই যেন বড় হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচিংনির্ভরতা, গাইডবইয়ের বাজার এবং মুখস্থবিদ্যার প্রবণতা। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ্যবই বোঝার চেয়ে পরীক্ষায় সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় ভালো ফল করছে, কিন্তু নিজের ভাষায় একটি বিষয় ব্যাখ্যা করতে, নতুন কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে কিংবা বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে।

শিক্ষক সংকট ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা

শিক্ষার মান উন্নয়নের আলোচনায় শিক্ষককে কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখতে হবে। একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল শিক্ষকই শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞানচর্চার আগ্রহ তৈরি করতে পারেন। কিন্তু শিক্ষকস্বল্পতা, নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের পরিবেশকে দুর্বল করছে।

২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষকপদ শূন্য থাকার তথ্য উঠে এসেছে। গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ও ব্যবহারিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের দায়িত্ব নিতে হলে কিংবা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ ছাড়া পাঠদান করতে হলে তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে।

শিক্ষককে কেবল নিয়োগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, যথাযথ মূল্যায়ন এবং পেশাগত স্বাধীনতা। একই সঙ্গে শিক্ষকতার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষা যখন আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তখনই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন ধনী ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান সমান সুযোগ পায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য শিক্ষার মান ও সুযোগ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। শহরের সচ্ছল পরিবারের সন্তান উন্নত বিদ্যালয়, কোচিং, প্রযুক্তি ও অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা পাচ্ছে; অন্যদিকে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু প্রয়োজনীয় বই, পুষ্টি, প্রযুক্তি কিংবা মানসম্মত শিক্ষকের সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে উত্তরণের পথে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও শিক্ষাসমাপ্তির হার কমে যাওয়ার তথ্যও উদ্বেগজনক। UNICEF-এর MICS 2025 অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক বয়সী শিশুদের ৩৩.৯ শতাংশ বিদ্যালয়ের বাইরে। অর্থনৈতিক চাপ, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষার ব্যয়—সব মিলিয়ে অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাচ্ছে।

শিক্ষা যদি পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা সামাজিক বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে বৈষম্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের দক্ষতা কোথায়?

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের প্রয়োজনের দূরত্ব। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত, উৎপাদনব্যবস্থা, গবেষণা, ব্যবস্থাপনা কিংবা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শিল্প ও উৎপাদন খাতের বাস্তবতা বলছে, শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে আধুনিক কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা কঠিন। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, তথ্য বিশ্লেষণ, যোগাযোগক্ষমতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা। অথচ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক শিক্ষা, গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং ইন্টার্নশিপের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে এখনো অনেক পরিবার সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কম মর্যাদার চোখে দেখে। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, প্রকৌশলী, মেশিন অপারেটর, সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ কিংবা উৎপাদন ব্যবস্থাপনা কর্মী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। ডিগ্রির মর্যাদার পাশাপাশি দক্ষতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

বাজেট বাড়লেই কি শিক্ষার মান বাড়বে?

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করার কথা জানানো হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ শতাংশ। বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থ কতটা পরিকল্পিতভাবে ব্যয় হবে এবং তার সুফল শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না।

শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যসামগ্রীর মান, গবেষণা, প্রযুক্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু বাজেটের অঙ্ক বড় হলেই শিক্ষার সংকট দূর হবে না; অর্থের কার্যকর ব্যবহারই হবে আসল পরীক্ষা।

কেমন হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা বারবার পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রাথমিক স্তরে বাংলা পাঠ-বোঝা, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার মূল্যায়ন চালু করতে হবে।

চতুর্থত, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো শিশু অর্থনৈতিক বা সামাজিক কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে। পঞ্চমত, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। ষষ্ঠত, শিক্ষা নীতিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে—সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার মৌলিক কাঠামো যেন রাজনৈতিক পরীক্ষাগারে পরিণত না হয়।

শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসম্পন্ন পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নয়; এটি একজন মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক, মানবিক ব্যক্তি ও যুক্তিবাদী চিন্তক হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।

শেষ কথা

বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা শিল্পকারখানা দেশের দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটায়; কিন্তু সেই উন্নয়নকে টেকসই করে দক্ষ, সৃজনশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ। একটি প্রজন্ম যদি প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতের অর্থনীতি, প্রশাসন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়বে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়, মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ দেওয়া নয়, যোগ্যতা তৈরি করা। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পাঠানো নয়, নিশ্চিত করা—প্রতিটি শিশু যেন বিদ্যালয় থেকে সত্যিকার অর্থে শিখে বের হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়াতে চাই, নাকি জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের গতিপথ।

ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। 



Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার মান কোথায়?
0:00 0:00
1.0x