ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩
Bengali Journal

মতামত

উন্নয়নের রাজনীতি বনাম মৌলবাদীদের উত্থান!

উন্নয়নের রাজনীতি বনাম মৌলবাদীদের উত্থান!

উন্নয়নের রাজনীতি বনাম মৌলবাদীদের উত্থান!

কেন বারবার হোঁচট খায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও প্রতিকূলতার ইতিহাস। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে উঠে আসা বাংলাদেশের গল্প পৃথিবীর বহু দেশের জন্য অনুপ্রেরণার। তৈরি পোশাকশিল্প, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, রেমিট্যান্স, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিক্ষা ও দারিদ্র্য হ্রাস—বিগত কয়েক দশকে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অগ্রযাত্রা বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানের মুখে কেন বাধাগ্রস্ত হয়?

প্রশ্নটি কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে দেখলে তার উত্তর পাওয়া যাবে না। বরং দেখতে হবে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের গভীরে জমে থাকা অসহিষ্ণুতার পারস্পরিক সম্পর্ককে।

উন্নয়ন শুধু সেতু-রাস্তা নয়

উন্নয়ন মানে শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা নতুন মহাসড়ক নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো—একটি নাগরিক এমন রাষ্ট্রে বসবাস করবে যেখানে তার নিরাপত্তা আছে, আইনের শাসন আছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং তার সন্তান তার যোগ্যতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বৈষম্য, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৬ সালের বিশ্বব্যাংক মূল্যায়নও ম্যাক্রো-স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

অর্থাৎ উন্নয়ন টেকসই করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন।

মৌলবাদ কেন জায়গা পায়?

মৌলবাদ কোনো শূন্যস্থানে জন্ম নেয় না।

যখন মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, যখন তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত হয়, যখন সামাজিক বৈষম্য বাড়ে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপায়—তখন সহজ ও আবেগনির্ভর স্লোগানের বাজার তৈরি হয়।

মৌলবাদী রাজনীতি সেই শূন্যস্থানকে কাজে লাগাতে পারে।

ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ধর্মকে যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনৈতিক মতাদর্শ এক জিনিস থাকে না। তখন 'আমরা' বনাম 'ওরা' বিভাজন তৈরি হয়।

আর এই বিভাজনই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের সংকটের আরেকটি দিক—রাজনৈতিক প্রতিহিংসা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা গেছে—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা।

এক সরকার অন্য সরকারের সময়কার সিদ্ধান্ত বাতিল করে, প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে, মামলা ও গ্রেপ্তার রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আবার ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রতিশোধের রাজনীতি ফিরে আসে।

ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দলীয় প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত হয়। এখানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণগুলোও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই পরিবর্তনের একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

অগ্রযাত্রা থেমে যায় যখন রাজনীতি ভবিষ্যতের বদলে অতীত নিয়ে বাঁচে

একটি জাতি যদি প্রতিদিন অতীতের প্রতিশোধ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সময় কোথায়?

বাংলাদেশের প্রয়োজন ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি। একই সঙ্গে ২০২৪-এর রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানিও আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সাম্প্রতিক বাস্তবতা। এসব ঘটনা নিয়ে ন্যায়বিচার, সত্য অনুসন্ধান এবং জবাবদিহি প্রয়োজন। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। ন্যায়বিচার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে; প্রতিশোধ রাষ্ট্রকে আরও বিভক্ত করে।

উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

একটি বিনিয়োগকারী জানতে চায়, আগামী পাঁচ বছর আইন একই থাকবে কি না। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, তার ব্যবসা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া চলবে কি না।

একজন তরুণ জানতে চায়, তার ভবিষ্যৎ দলীয় পরিচয় নয়, যোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে কি না।

একজন সংখ্যালঘু নাগরিক জানতে চান—সংখ্যাগরিষ্ঠতার উন্মাদনার মধ্যেও রাষ্ট্র তাকে সমান নাগরিক হিসেবে রক্ষা করবে কি না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তবে বাংলাদেশ এগোবে।

আর উত্তর যদি অনিশ্চিত হয়, তবে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করেও একটি রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে না।

ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্ম: এখানে আসল বিতর্কটি অন্য জায়গায়

বাংলাদেশকে আধুনিক করতে হলে ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে সম্মান করতে হবে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের জন্য সমান রাখতে হবে।

মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষ, সবার রাষ্ট্র একই।

এই জায়গাটিই মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক পার্থক্য।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে বেশি বা কম অধিকার দিতে পারে না।

তাহলে বারবার হোঁচট খায় কেন বাংলাদেশ?

কারণ বাংলাদেশের সমস্যা কেবল মৌলবাদ নয়। সমস্যা হলো—

দুর্বল প্রতিষ্ঠান + রাজনৈতিক প্রতিহিংসা + অর্থনৈতিক বৈষম্য + বেকারত্ব + দুর্নীতি + বিচারহীনতার সংস্কৃতি + অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি + ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার।

এই সবগুলো যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।

তাই শুধু মৌলবাদীদের দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি এবং সহনশীলতার প্রশ্নে আত্মসমালোচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ?

বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ:

একটি হলো বিভাজনের রাজনীতি, কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী;

কে ধর্মের পক্ষে, কে ধর্মের বিপক্ষে;
কে আমাদের, কে তাদের—এই প্রশ্নে জাতিকে ক্রমাগত বিভক্ত করা।

অন্য পথটি হলো উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের সমন্বিত পথ।এই পথে রাষ্ট্র হবে শক্তিশালী, কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতার ওপর নয়।সরকার হবে ক্ষমতাবান, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে নয়। ধর্ম থাকবে মানুষের হৃদয়ে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হবে না। বিরোধী দল থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে না। আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নির্বাচনে—রাস্তায় আগুন, সহিংসতা কিংবা প্রতিশোধে নয়।

শেষ কথা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। এই মানুষ যুদ্ধ করেছে, দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেছে, বন্যা মোকাবিলা করেছে, দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে, পৃথিবীর পোশাকশিল্পে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে এবং কোটি কোটি মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে।তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার নয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিতও নয়।

অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে উন্নয়নের রাজনীতিকে কেবল অবকাঠামোর রাজনীতি থেকে বের করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সামাজিক সহনশীলতার রাজনীতিতে পরিণত করতে হবে।

মৌলবাদকে মোকাবিলা করতে হবে কেবল স্লোগানে নয়—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, মানবিক রাষ্ট্র এবং যুক্তিবাদী সমাজ নির্মাণের মাধ্যমে।

কারণ অন্ধকারকে গালি দিয়ে সূর্য ওঠে না। সূর্য ওঠে যখন একটি জাতি অন্ধকারের কারণগুলো বুঝতে শেখে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?

আমরা কি অতীতের প্রতিশোধের রাজনীতি করব, নাকি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণ করব?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খাবে, নাকি এবার সত্যিই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে যাবে।

ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন 

কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। মুলুজ,ফ্রানৃস

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬


উন্নয়নের রাজনীতি বনাম মৌলবাদীদের উত্থান!

প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

উন্নয়নের রাজনীতি বনাম মৌলবাদীদের উত্থান!

কেন বারবার হোঁচট খায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও প্রতিকূলতার ইতিহাস। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পথে উঠে আসা বাংলাদেশের গল্প পৃথিবীর বহু দেশের জন্য অনুপ্রেরণার। তৈরি পোশাকশিল্প, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, রেমিট্যান্স, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, শিক্ষা ও দারিদ্র্য হ্রাস—বিগত কয়েক দশকে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অগ্রযাত্রা বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানের মুখে কেন বাধাগ্রস্ত হয়?

প্রশ্নটি কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়িয়ে দেখলে তার উত্তর পাওয়া যাবে না। বরং দেখতে হবে রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের গভীরে জমে থাকা অসহিষ্ণুতার পারস্পরিক সম্পর্ককে।

উন্নয়ন শুধু সেতু-রাস্তা নয়

উন্নয়ন মানে শুধু পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা নতুন মহাসড়ক নয়। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো—একটি নাগরিক এমন রাষ্ট্রে বসবাস করবে যেখানে তার নিরাপত্তা আছে, আইনের শাসন আছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং তার সন্তান তার যোগ্যতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বৈষম্য, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৬ সালের বিশ্বব্যাংক মূল্যায়নও ম্যাক্রো-স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

অর্থাৎ উন্নয়ন টেকসই করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন।

মৌলবাদ কেন জায়গা পায়?

মৌলবাদ কোনো শূন্যস্থানে জন্ম নেয় না।

যখন মানুষ রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়, যখন তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত হয়, যখন সামাজিক বৈষম্য বাড়ে, যখন রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপায়—তখন সহজ ও আবেগনির্ভর স্লোগানের বাজার তৈরি হয়।

মৌলবাদী রাজনীতি সেই শূন্যস্থানকে কাজে লাগাতে পারে।

ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ধর্মকে যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ধর্মীয় বিশ্বাস আর রাজনৈতিক মতাদর্শ এক জিনিস থাকে না। তখন 'আমরা' বনাম 'ওরা' বিভাজন তৈরি হয়।

আর এই বিভাজনই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের সংকটের আরেকটি দিক—রাজনৈতিক প্রতিহিংসা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভয়াবহ প্রবণতা দেখা গেছে—ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা।

এক সরকার অন্য সরকারের সময়কার সিদ্ধান্ত বাতিল করে, প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে, মামলা ও গ্রেপ্তার রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আবার ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রতিশোধের রাজনীতি ফিরে আসে।

ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দলীয় প্রতিযোগিতার মাঠে পরিণত হয়। এখানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণগুলোও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচন সেই পরিবর্তনের একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

অগ্রযাত্রা থেমে যায় যখন রাজনীতি ভবিষ্যতের বদলে অতীত নিয়ে বাঁচে

একটি জাতি যদি প্রতিদিন অতীতের প্রতিশোধ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সময় কোথায়?

বাংলাদেশের প্রয়োজন ইতিহাসকে অস্বীকার করা নয়; বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি। একই সঙ্গে ২০২৪-এর রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানিও আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সাম্প্রতিক বাস্তবতা। এসব ঘটনা নিয়ে ন্যায়বিচার, সত্য অনুসন্ধান এবং জবাবদিহি প্রয়োজন। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। ন্যায়বিচার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে; প্রতিশোধ রাষ্ট্রকে আরও বিভক্ত করে।

উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

একটি বিনিয়োগকারী জানতে চায়, আগামী পাঁচ বছর আইন একই থাকবে কি না। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, তার ব্যবসা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া চলবে কি না।

একজন তরুণ জানতে চায়, তার ভবিষ্যৎ দলীয় পরিচয় নয়, যোগ্যতার ওপর নির্ভর করবে কি না।

একজন সংখ্যালঘু নাগরিক জানতে চান—সংখ্যাগরিষ্ঠতার উন্মাদনার মধ্যেও রাষ্ট্র তাকে সমান নাগরিক হিসেবে রক্ষা করবে কি না।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি 'হ্যাঁ' হয়, তবে বাংলাদেশ এগোবে।

আর উত্তর যদি অনিশ্চিত হয়, তবে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করেও একটি রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে না।

ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ধর্ম: এখানে আসল বিতর্কটি অন্য জায়গায়

বাংলাদেশকে আধুনিক করতে হলে ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে সম্মান করতে হবে এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে সব নাগরিকের জন্য সমান রাখতে হবে।

মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষ, সবার রাষ্ট্র একই।

এই জায়গাটিই মৌলবাদী রাজনীতির সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক পার্থক্য।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে বেশি বা কম অধিকার দিতে পারে না।

তাহলে বারবার হোঁচট খায় কেন বাংলাদেশ?

কারণ বাংলাদেশের সমস্যা কেবল মৌলবাদ নয়। সমস্যা হলো—

দুর্বল প্রতিষ্ঠান + রাজনৈতিক প্রতিহিংসা + অর্থনৈতিক বৈষম্য + বেকারত্ব + দুর্নীতি + বিচারহীনতার সংস্কৃতি + অসহিষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতি + ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার।

এই সবগুলো যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখন রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়।

তাই শুধু মৌলবাদীদের দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, জবাবদিহি এবং সহনশীলতার প্রশ্নে আত্মসমালোচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন কোন পথ?

বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ:

একটি হলো বিভাজনের রাজনীতি, কে দেশপ্রেমিক, কে দেশদ্রোহী;

কে ধর্মের পক্ষে, কে ধর্মের বিপক্ষে;
কে আমাদের, কে তাদের—এই প্রশ্নে জাতিকে ক্রমাগত বিভক্ত করা।

অন্য পথটি হলো উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের সমন্বিত পথ।এই পথে রাষ্ট্র হবে শক্তিশালী, কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতার ওপর নয়।সরকার হবে ক্ষমতাবান, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে নয়। ধর্ম থাকবে মানুষের হৃদয়ে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হবে না। বিরোধী দল থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে না। আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নির্বাচনে—রাস্তায় আগুন, সহিংসতা কিংবা প্রতিশোধে নয়।

শেষ কথা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ। এই মানুষ যুদ্ধ করেছে, দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করেছে, বন্যা মোকাবিলা করেছে, দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে, পৃথিবীর পোশাকশিল্পে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে এবং কোটি কোটি মানুষকে বিদেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে।তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার নয়। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিতও নয়।

অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে উন্নয়নের রাজনীতিকে কেবল অবকাঠামোর রাজনীতি থেকে বের করে মানুষ, প্রতিষ্ঠান, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সামাজিক সহনশীলতার রাজনীতিতে পরিণত করতে হবে।

মৌলবাদকে মোকাবিলা করতে হবে কেবল স্লোগানে নয়—শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, মানবিক রাষ্ট্র এবং যুক্তিবাদী সমাজ নির্মাণের মাধ্যমে।

কারণ অন্ধকারকে গালি দিয়ে সূর্য ওঠে না। সূর্য ওঠে যখন একটি জাতি অন্ধকারের কারণগুলো বুঝতে শেখে। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন?

আমরা কি অতীতের প্রতিশোধের রাজনীতি করব, নাকি ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণ করব?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খাবে, নাকি এবার সত্যিই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে যাবে।

ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন 

কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। মুলুজ,ফ্রানৃস


Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
উন্নয়নের রাজনীতি বনাম মৌলবাদীদের উত্থান!
0:00 0:00
1.0x