একটি মেয়ে রাতে একা কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, তার পোশাক কেমন ছিল—এসব প্রশ্নের আড়ালে যদি একজন মানুষের হত্যার দায় চাপা পড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাটিই গভীর সংকটে পড়েছে। কোনো মানুষ কখন, কোথায়, কী পোশাক পরে চলাফেরা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে; কিন্তু এসব প্রশ্ন কখনোই তাঁর ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় তাঁর নিজের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার যুক্তি হতে পারে না। একজন মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে গিয়ে কেন প্রাণ হারাবেন—তাজমিনের মৃত্যুকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত এই প্রশ্নটিই। প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তাজমিন ছিল যশোরের মেয়ে। বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লায় বসবাস করত। তাঁর বয়স প্রায় ১৫ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, জীবনের কৈশোরে পা রাখা একটি মেয়ে—নিজের মতো করে পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে চাইবে, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চাইবে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করবে—এটাই স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা। কিন্তু সেই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার পরিণতি যদি হয় মৃত্যু, তবে প্রশ্ন উঠবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নারী-নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: রাতের বেলায় একজন কিশোরী কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, কার সঙ্গে ছিল—এসব তথ্য ঘটনার তদন্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু তদন্তে কোনো তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা আর অপরাধের জন্য ভুক্তভোগীকে দায়ী করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি সত্য উদ্ঘাটনের পথ, দ্বিতীয়টি ন্যায়বিচারের পথে বাধা। অপরাধের দায় অপরাধীর; ভুক্তভোগীর পোশাক, সময় নির্বাচন কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সেই দায়ের বিকল্প হতে পারে না।
কোনো নারী বা কিশোরী সহিংসতার শিকার হলে আমাদের সমাজের একটি অংশ প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—সে এত রাতে বাইরে কেন ছিল? তার পোশাক কেমন ছিল? পরিবারের নজরদারি কোথায় ছিল? মেয়েটিকে আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল না? প্রশ্নগুলো শুনতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মতো মনে হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো অপরাধীর কর্মকাণ্ড থেকে আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে ভুক্তভোগীর জীবনযাপনের দিকে নিয়ে যায়। ফলে অপরাধীর দায় নিয়ে আলোচনা পেছনে পড়ে যায়, আর মৃত মানুষটির ব্যক্তিগত জীবন হয়ে ওঠে জনসমক্ষে বিচার করার বিষয়। এই প্রবণতাকেই বলা হয় ভিকটিম ব্লেইমিং—অর্থাৎ অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী করা। এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি অপরাধীকে সামাজিকভাবে দায়মুক্তির সুযোগ দেয় এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের আলোচনাকেও দুর্বল করে। একজন কিশোরী রাতে বাইরে ছিল—এটি কোনোভাবেই কাউকে তাকে হত্যা করার অধিকার দেয় না। একজন নারী নিজের পছন্দমতো পোশাক পরেছেন—সেটিও তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতার বৈধতা তৈরি করে না। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে অপরাধের দায়কে গুলিয়ে ফেলা ন্যায়বিচার নয়; বরং অপরাধের সামাজিক ব্যাখ্যাকে বিকৃত করা।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে নানা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে স্বাধীনতার নতুন বয়ান যতই উচ্চারিত হোক, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে। স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়। স্বাধীনতার অর্থ নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের সমান প্রয়োগ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ভয় ছাড়া দৈনন্দিন জীবন যাপনের নিশ্চয়তা। একটি কিশোরী যদি নিরাপদে চলাফেরা করতে না পারে, একজন নারী যদি সহিংসতার আশঙ্কায় নিজের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করতে বাধ্য হন, তাহলে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংগত। তবে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংঘটিত প্রতিটি অপরাধকে সরাসরি সেই পরিবর্তনের ফল বলে ধরে নেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। অপরাধের প্রকৃতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, তদন্তের ফলাফল এবং বিচারপ্রক্রিয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে এখানে জরুরি নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহি।
একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা নেওয়া কিংবা অপরাধীকে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া নয়। অপরাধ প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ কী? তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে? সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? সাক্ষী ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি? বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া হচ্ছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, প্রমাণ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে দিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব যেন বিচারের পথে বাধা না হয়। একইভাবে অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নির্ধারিত হয় না।
তাজমিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক দোষারোপ কিংবা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের বক্তব্য বিচার করার প্রবণতা দেখা গেলে তা মূল প্রশ্নটিকে আড়াল করতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা কী বলছেন, সেটি আলোচনার বিষয় হতে পারে; কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া পুরো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা ন্যায়সংগত নয়। একইভাবে সরকারবিরোধী বক্তব্য দিলেই কেউ সত্যের পক্ষে, কিংবা সরকারের পক্ষে কথা বললেই কেউ অপরাধকে সমর্থন করছেন—এমন সরল বিভাজনও বাস্তবতাকে ধারণ করে না। অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে নীতির ভিত্তিতে, দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। একজন কিশোরীর নিরাপত্তা কোনো দলের একক দাবি হতে পারে না। ন্যায়বিচারও কোনো রাজনৈতিক পক্ষের একচেটিয়া সম্পদ নয়। যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার করা তার দায়িত্ব।
আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মেয়েরা নিরাপদ থাকার জন্য নিজেদের স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত করবে? নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রত্যেকে নিজের জীবন ও চলাফেরা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ভোগ করবে এবং আইন সেই অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে? পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে সন্তানকে নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা, বিপদের ঝুঁকি বোঝানো এবং তাদের সঙ্গে আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কিন্তু পারিবারিক সতর্কতা কখনোই রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প নয়। একটি পরিবার তার সন্তানকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে না; সেই কারণেই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে জরুরি হলো সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য বন্ধ করা এবং পরিবারের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন কিশোরী রাতে কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল—তদন্তের প্রয়োজনে সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু তার উত্তর কখনোই হত্যার দায় মুছে দিতে পারে না। কোনো মানুষের স্বাধীনতা অপরাধীর জন্য সহিংসতার অনুমতিপত্র নয়। তাজমিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আমাদের ক্ষোভ যেন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্কে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ক্ষোভকে রূপ দিতে হবে ন্যায়বিচারের দাবি, নিরাপদ জনপরিসর গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আন্দোলনে। একটি সভ্য সমাজে প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন কিশোরী রাতে বাইরে ছিল কেন, শুধু তা নয়; বরং একজন মানুষকে হত্যা করার সাহস অপরাধী পেল কীভাবে, আর তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে রাষ্ট্র কী করছে? স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একজন নারী কিংবা কিশোরীকে নিরাপদ থাকার জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে না। রাষ্ট্রের শক্তি মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা সংকুচিত করার মধ্যে নয়; বরং সেই স্বাধীনতা নিরাপদ রাখার সক্ষমতার মধ্যে। তাজমিনের জন্য ন্যায়বিচার চাই। শুধু তাঁর জন্য নয়—এমন একটি বাংলাদেশের জন্য, যেখানে কোনো মেয়ের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার পোশাক, সময় কিংবা স্বাধীনতাকে অপরাধের কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হবে না। অপরাধীর বিচার হোক, ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষিত হোক, আর রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করুক।
ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬
একটি মেয়ে রাতে একা কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, তার পোশাক কেমন ছিল—এসব প্রশ্নের আড়ালে যদি একজন মানুষের হত্যার দায় চাপা পড়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাটিই গভীর সংকটে পড়েছে। কোনো মানুষ কখন, কোথায়, কী পোশাক পরে চলাফেরা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে; কিন্তু এসব প্রশ্ন কখনোই তাঁর ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় তাঁর নিজের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার যুক্তি হতে পারে না। একজন মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে গিয়ে কেন প্রাণ হারাবেন—তাজমিনের মৃত্যুকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত এই প্রশ্নটিই। প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তাজমিন ছিল যশোরের মেয়ে। বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লায় বসবাস করত। তাঁর বয়স প্রায় ১৫ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, জীবনের কৈশোরে পা রাখা একটি মেয়ে—নিজের মতো করে পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে চাইবে, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে চাইবে, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনুভব করবে—এটাই স্বাভাবিক মানবিক প্রবণতা। কিন্তু সেই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার পরিণতি যদি হয় মৃত্যু, তবে প্রশ্ন উঠবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নারী-নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: রাতের বেলায় একজন কিশোরী কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল, কার সঙ্গে ছিল—এসব তথ্য ঘটনার তদন্তে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। কিন্তু তদন্তে কোনো তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা আর অপরাধের জন্য ভুক্তভোগীকে দায়ী করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি সত্য উদ্ঘাটনের পথ, দ্বিতীয়টি ন্যায়বিচারের পথে বাধা। অপরাধের দায় অপরাধীর; ভুক্তভোগীর পোশাক, সময় নির্বাচন কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সেই দায়ের বিকল্প হতে পারে না।
কোনো নারী বা কিশোরী সহিংসতার শিকার হলে আমাদের সমাজের একটি অংশ প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—সে এত রাতে বাইরে কেন ছিল? তার পোশাক কেমন ছিল? পরিবারের নজরদারি কোথায় ছিল? মেয়েটিকে আরও সাবধান হওয়া উচিত ছিল না? প্রশ্নগুলো শুনতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মতো মনে হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো অপরাধীর কর্মকাণ্ড থেকে আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে ভুক্তভোগীর জীবনযাপনের দিকে নিয়ে যায়। ফলে অপরাধীর দায় নিয়ে আলোচনা পেছনে পড়ে যায়, আর মৃত মানুষটির ব্যক্তিগত জীবন হয়ে ওঠে জনসমক্ষে বিচার করার বিষয়। এই প্রবণতাকেই বলা হয় ভিকটিম ব্লেইমিং—অর্থাৎ অপরাধের শিকার ব্যক্তিকেই তাঁর ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী করা। এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি অপরাধীকে সামাজিকভাবে দায়মুক্তির সুযোগ দেয় এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের আলোচনাকেও দুর্বল করে। একজন কিশোরী রাতে বাইরে ছিল—এটি কোনোভাবেই কাউকে তাকে হত্যা করার অধিকার দেয় না। একজন নারী নিজের পছন্দমতো পোশাক পরেছেন—সেটিও তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতার বৈধতা তৈরি করে না। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে অপরাধের দায়কে গুলিয়ে ফেলা ন্যায়বিচার নয়; বরং অপরাধের সামাজিক ব্যাখ্যাকে বিকৃত করা।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে নানা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে স্বাধীনতার নতুন বয়ান যতই উচ্চারিত হোক, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন কতটা ঘটছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে। স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়। স্বাধীনতার অর্থ নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের সমান প্রয়োগ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ভয় ছাড়া দৈনন্দিন জীবন যাপনের নিশ্চয়তা। একটি কিশোরী যদি নিরাপদে চলাফেরা করতে না পারে, একজন নারী যদি সহিংসতার আশঙ্কায় নিজের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করতে বাধ্য হন, তাহলে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংগত। তবে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংঘটিত প্রতিটি অপরাধকে সরাসরি সেই পরিবর্তনের ফল বলে ধরে নেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। অপরাধের প্রকৃতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, তদন্তের ফলাফল এবং বিচারপ্রক্রিয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নির্ধারণ করতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে এখানে জরুরি নির্ভরযোগ্য তথ্য, স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহি।
একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা নেওয়া কিংবা অপরাধীকে গ্রেপ্তারের আশ্বাস দেওয়া নয়। অপরাধ প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখাও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় তাই কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ কী? তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে? সন্দেহভাজনদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? সাক্ষী ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি? বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া হচ্ছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে নয়, প্রমাণ ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে দিতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব যেন বিচারের পথে বাধা না হয়। একইভাবে অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নির্ধারিত হয় না।
তাজমিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক দোষারোপ কিংবা দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের বক্তব্য বিচার করার প্রবণতা দেখা গেলে তা মূল প্রশ্নটিকে আড়াল করতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা কী বলছেন, সেটি আলোচনার বিষয় হতে পারে; কিন্তু পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া পুরো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করা ন্যায়সংগত নয়। একইভাবে সরকারবিরোধী বক্তব্য দিলেই কেউ সত্যের পক্ষে, কিংবা সরকারের পক্ষে কথা বললেই কেউ অপরাধকে সমর্থন করছেন—এমন সরল বিভাজনও বাস্তবতাকে ধারণ করে না। অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে নীতির ভিত্তিতে, দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। একজন কিশোরীর নিরাপত্তা কোনো দলের একক দাবি হতে পারে না। ন্যায়বিচারও কোনো রাজনৈতিক পক্ষের একচেটিয়া সম্পদ নয়। যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার করা তার দায়িত্ব।
আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে মেয়েরা নিরাপদ থাকার জন্য নিজেদের স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত করবে? নাকি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে প্রত্যেকে নিজের জীবন ও চলাফেরা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ভোগ করবে এবং আইন সেই অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে? পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে সন্তানকে নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা, বিপদের ঝুঁকি বোঝানো এবং তাদের সঙ্গে আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। কিন্তু পারিবারিক সতর্কতা কখনোই রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প নয়। একটি পরিবার তার সন্তানকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে না; সেই কারণেই নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে জরুরি হলো সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য বন্ধ করা এবং পরিবারের গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন কিশোরী রাতে কোথায় গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল—তদন্তের প্রয়োজনে সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু তার উত্তর কখনোই হত্যার দায় মুছে দিতে পারে না। কোনো মানুষের স্বাধীনতা অপরাধীর জন্য সহিংসতার অনুমতিপত্র নয়। তাজমিনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আমাদের ক্ষোভ যেন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তর্কে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ক্ষোভকে রূপ দিতে হবে ন্যায়বিচারের দাবি, নিরাপদ জনপরিসর গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আন্দোলনে। একটি সভ্য সমাজে প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন কিশোরী রাতে বাইরে ছিল কেন, শুধু তা নয়; বরং একজন মানুষকে হত্যা করার সাহস অপরাধী পেল কীভাবে, আর তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে রাষ্ট্র কী করছে? স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একজন নারী কিংবা কিশোরীকে নিরাপদ থাকার জন্য নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হবে না। রাষ্ট্রের শক্তি মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা সংকুচিত করার মধ্যে নয়; বরং সেই স্বাধীনতা নিরাপদ রাখার সক্ষমতার মধ্যে। তাজমিনের জন্য ন্যায়বিচার চাই। শুধু তাঁর জন্য নয়—এমন একটি বাংলাদেশের জন্য, যেখানে কোনো মেয়ের জীবন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার পোশাক, সময় কিংবা স্বাধীনতাকে অপরাধের কারণ হিসেবে দাঁড় করানো হবে না। অপরাধীর বিচার হোক, ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষিত হোক, আর রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করুক।
ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আপনার মতামত লিখুন