পতন কি শেখ হাসিনার হয়েছে, নাকি পতন হয়েছে বাংলাদেশের?
শেখ হাসিনার পতনের দুই বছর পর জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন
৫ আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিভাজনরেখা। একটি সরকারের পতন, একজন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় আকস্মিক পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি এখন বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি।
দুই বছর পর প্রশ্নটি তাই শুধু শেখ হাসিনাকে নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সেদিন কি কেবল একজন শাসকের পতন হয়েছিল, নাকি সেই পতনের অভিঘাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং সামাজিক ঐক্যেরও ক্ষয় শুরু হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক হতে পারে না।
কারণ ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে একদিকে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক এবং সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ; অন্যদিকে ছিল সহিংসতা, প্রাণহানি, প্রতিশোধের রাজনীতি এবং পরবর্তী সময়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বাদ পড়ার বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও ২০২৪ সালের আন্দোলন ও দমন-পীড়ন নিয়ে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ নথিভুক্ত হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসের বিচার শুধু একটি পক্ষের বক্তব্য শুনে সম্পূর্ণ হয় না।
দুই বছর পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়; পরবর্তীতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ঘটে; আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হয় এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—
কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থাকলে সেই দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকারও কি একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?
গণতন্ত্রের উত্তর হওয়া উচিত—না।
কারণ গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক; রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ বা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক সমাধান নয়। একটি দলের অপরাধী ব্যক্তি ও সেই দলের কোটি মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়কে একই পাল্লায় মাপা হলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে একটি দলের অতীতের গুরুতর অভিযোগ ও মানবাধিকার প্রশ্নকে শুধু রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে অস্বীকার করাও গণতন্ত্রের পক্ষে নিরাপদ নয়।
অতএব প্রয়োজন জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য।
শেখ হাসিনার শাসন আমল: উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্রের বিতর্ক
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলকে শুধু একটি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ডিজিটাল সেবা ও সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—একই সঙ্গে দুর্নীতি, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে গুরুতর সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও এই দ্বৈত বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে।
অতএব ইতিহাসের সৎ মূল্যায়ন হবে এমন—
উন্নয়নকে অস্বীকার করা যাবে না, আবার উন্নয়নের নামে গণতান্ত্রিক ঘাটতিকেও আড়াল করা যাবে না।
একইভাবে ২০২৪ সালের পরের বাংলাদেশকেও একই মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে।
পরিবর্তনের নামে যদি নতুন অন্যায় জন্ম নেয়, তবে ইতিহাস শুধু পুরোনো অন্যায়ের বিচার করবে না—নতুন অন্যায়েরও বিচার করবে।
পতনের পর কি বাংলাদেশ সত্যিই এগিয়েছে?
এখানে আবেগ নয়, বাস্তবতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার মতো সমস্যার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নগুলোও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তন নিজে কোনো অর্থনৈতিক নীতি নয়। সরকার পরিবর্তন হলেই মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটে না।
মানুষ চায়—
কাজ।
ন্যায্য মজুরি।
কম মূল্যস্ফীতি।
নিরাপদ জীবন।
শিক্ষা।
স্বাস্থ্যসেবা।
বিনিয়োগ।
সামাজিক মর্যাদা।
একটি কার্যকর রাষ্ট্র।
সুতরাং প্রশ্ন হওয়া উচিত—৫ আগস্টের পর সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত দেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে একটি জটিল কূটনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করেছে। ঢাকা তাঁর প্রত্যর্পণ চাইছে; ভারত বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করছে। একই সময়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও চলছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে।
এখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের মূলনীতি হওয়া উচিত—
কোনো পরাশক্তির ছায়া নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র।
বাংলাদেশের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও কৌশলগত শক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
একজন রাজনৈতিক নেতার পতন বা উত্থান দিয়ে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায় না। তাহলে শেখ হাসিনার পতন—নাকি একটি রাজনৈতিক যুগের পতন?
সম্ভবত সবচেয়ে নিরপেক্ষ উত্তর হলো—দুটিই ঘটেছে। একজন নেতার রাজনৈতিক ক্ষমতার পতন হয়েছে। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগেরও সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পতন হয়নি।
বাংলাদেশ টিকে আছে—এবং সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য।
তবে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু ভূখণ্ডে নয়; রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থায়।
সেই জায়গায় যদি বিভাজন বাড়ে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাড়ে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখা হয় এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সীমিত হয়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই:
আমরা কি একজনকে সরিয়ে একটি ব্যবস্থা পরিবর্তন করেছি, নাকি কেবল ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন করেছি?
জাতির বিবেকের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন
দুই বছর পর আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—
প্রথমত: আমরা কি এমন বাংলাদেশ পেয়েছি যেখানে ভিন্নমত নিরাপদ?
দ্বিতীয়ত: আমরা কি এমন নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয়ের জন্য সমান রাজনৈতিক মাঠ থাকবে?
তৃতীয়ত: আমরা কি রাজনৈতিক অপরাধের বিচার করছি, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার করছি?
চতুর্থত: আমরা কি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের জাতীয় পুনর্মিলনের দিকে এগোচ্ছি?
পঞ্চমত: আমরা কি এমন অর্থনীতি তৈরি করছি যেখানে তরুণদের ভবিষ্যৎ আছে?
ষষ্ঠত: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি জাতীয় স্বার্থনির্ভর থাকবে, নাকি আমরা ক্রমশ ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে চলে যাব?
সপ্তমত: ইতিহাস কি আমরা লিখব তথ্য দিয়ে, নাকি বিজয়ী পক্ষের ভাষ্যে?
ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা:
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনা হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি শিক্ষা দিয়েছে—
কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়।
আজ যে ক্ষমতায়, কাল সে ক্ষমতার বাইরে যেতে পারে। আজ যে বিরোধী, কাল সে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে। তাই রাষ্ট্রকে কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের সম্পত্তিতে পরিণত করা বিপজ্জনক।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও তাই শুধু তাঁর সমর্থকদের নয়; সমালোচকদেরও আলোচনার বিষয়। তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটিই ইতিহাসের সম্পদ। একইভাবে ২০২৪-এর আন্দোলনের আত্মত্যাগ, মানুষের ক্ষোভ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনও বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।
কিন্তু ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে পবিত্র বা অভিশপ্ত ঘোষণা করে দিলে ইতিহাসের শিক্ষা নষ্ট হয়।
শেষ প্রশ্নটি তাই শেখ হাসিনাকে নয়—আমাদের, দুই বছর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো, শেখ হাসিনা কি পরাজিত হয়েছেন? নাকি—
বাংলাদেশ কি তার একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা হারিয়েছে?
উত্তর সময় দেবে।
শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের আগস্টে আবার প্রকাশ্যে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার দাবি জানিয়েছেন; একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও তীব্রভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। কিন্তু একজন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—
গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হলো,
আইনের শাসন কতটা নিরপেক্ষ হলো,
অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল হলো,
তরুণদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ হলো,
এবং আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে রাজনৈতিক সহাবস্থান কতটা শিখলাম।
সুতরাং দুই বছর পর জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্নটি হোক—
“কে পতিত হলো?”—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, “আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে কোনো নেতার উত্থান বা পতনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাগ্যকে আর বাঁধতে হবে না?”
কারণ শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির ঊর্ধ্বে একটি নামই থাকবে— বাংলাদেশ। তবে এটাও ঠিক, মুক্তিযোদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা অথবা আওয়ামীলীগ, বাংলাদেশেরই আরেক নাম।
ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক
মুলুজ, ফ্রান্স

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
পতন কি শেখ হাসিনার হয়েছে, নাকি পতন হয়েছে বাংলাদেশের?
শেখ হাসিনার পতনের দুই বছর পর জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন
৫ আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিভাজনরেখা। একটি সরকারের পতন, একজন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোয় আকস্মিক পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে দিনটি এখন বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি।
দুই বছর পর প্রশ্নটি তাই শুধু শেখ হাসিনাকে নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সেদিন কি কেবল একজন শাসকের পতন হয়েছিল, নাকি সেই পতনের অভিঘাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং সামাজিক ঐক্যেরও ক্ষয় শুরু হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক হতে পারে না।
কারণ ২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহে একদিকে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক এবং সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ; অন্যদিকে ছিল সহিংসতা, প্রাণহানি, প্রতিশোধের রাজনীতি এবং পরবর্তী সময়ে একটি বড় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বাদ পড়ার বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও ২০২৪ সালের আন্দোলন ও দমন-পীড়ন নিয়ে গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ নথিভুক্ত হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসের বিচার শুধু একটি পক্ষের বক্তব্য শুনে সম্পূর্ণ হয় না।
দুই বছর পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
২০২৪ সালের আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়; পরবর্তীতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ঘটে; আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হয় এবং ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—
কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ থাকলে সেই দলের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকারও কি একই সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?
গণতন্ত্রের উত্তর হওয়া উচিত—না।
কারণ গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক; রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ বা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক সমাধান নয়। একটি দলের অপরাধী ব্যক্তি ও সেই দলের কোটি মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়কে একই পাল্লায় মাপা হলে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে একটি দলের অতীতের গুরুতর অভিযোগ ও মানবাধিকার প্রশ্নকে শুধু রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে অস্বীকার করাও গণতন্ত্রের পক্ষে নিরাপদ নয়।
অতএব প্রয়োজন জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য।
শেখ হাসিনার শাসন আমল: উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্রের বিতর্ক
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলকে শুধু একটি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, ডিজিটাল সেবা ও সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে—একই সঙ্গে দুর্নীতি, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে গুরুতর সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও এই দ্বৈত বাস্তবতার কথা উঠে এসেছে।
অতএব ইতিহাসের সৎ মূল্যায়ন হবে এমন—
উন্নয়নকে অস্বীকার করা যাবে না, আবার উন্নয়নের নামে গণতান্ত্রিক ঘাটতিকেও আড়াল করা যাবে না।
একইভাবে ২০২৪ সালের পরের বাংলাদেশকেও একই মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে।
পরিবর্তনের নামে যদি নতুন অন্যায় জন্ম নেয়, তবে ইতিহাস শুধু পুরোনো অন্যায়ের বিচার করবে না—নতুন অন্যায়েরও বিচার করবে।
পতনের পর কি বাংলাদেশ সত্যিই এগিয়েছে?
এখানে আবেগ নয়, বাস্তবতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তার মতো সমস্যার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নগুলোও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছে।
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তন নিজে কোনো অর্থনৈতিক নীতি নয়। সরকার পরিবর্তন হলেই মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটে না।
মানুষ চায়—
কাজ।
ন্যায্য মজুরি।
কম মূল্যস্ফীতি।
নিরাপদ জীবন।
শিক্ষা।
স্বাস্থ্যসেবা।
বিনিয়োগ।
সামাজিক মর্যাদা।
একটি কার্যকর রাষ্ট্র।
সুতরাং প্রশ্ন হওয়া উচিত—৫ আগস্টের পর সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে?
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত দেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে একটি জটিল কূটনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করেছে। ঢাকা তাঁর প্রত্যর্পণ চাইছে; ভারত বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করছে। একই সময়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাও চলছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে।
এখানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের মূলনীতি হওয়া উচিত—
কোনো পরাশক্তির ছায়া নয়; বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র।
বাংলাদেশের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও কৌশলগত শক্তি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার।
একজন রাজনৈতিক নেতার পতন বা উত্থান দিয়ে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায় না। তাহলে শেখ হাসিনার পতন—নাকি একটি রাজনৈতিক যুগের পতন?
সম্ভবত সবচেয়ে নিরপেক্ষ উত্তর হলো—দুটিই ঘটেছে। একজন নেতার রাজনৈতিক ক্ষমতার পতন হয়েছে। একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগেরও সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পতন হয়নি।
বাংলাদেশ টিকে আছে—এবং সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য।
তবে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু ভূখণ্ডে নয়; রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক আস্থায়।
সেই জায়গায় যদি বিভাজন বাড়ে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাড়ে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখা হয় এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সীমিত হয়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই:
আমরা কি একজনকে সরিয়ে একটি ব্যবস্থা পরিবর্তন করেছি, নাকি কেবল ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন করেছি?
জাতির বিবেকের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন
দুই বছর পর আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—
প্রথমত: আমরা কি এমন বাংলাদেশ পেয়েছি যেখানে ভিন্নমত নিরাপদ?
দ্বিতীয়ত: আমরা কি এমন নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয়ের জন্য সমান রাজনৈতিক মাঠ থাকবে?
তৃতীয়ত: আমরা কি রাজনৈতিক অপরাধের বিচার করছি, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার করছি?
চতুর্থত: আমরা কি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সত্যিকারের জাতীয় পুনর্মিলনের দিকে এগোচ্ছি?
পঞ্চমত: আমরা কি এমন অর্থনীতি তৈরি করছি যেখানে তরুণদের ভবিষ্যৎ আছে?
ষষ্ঠত: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি জাতীয় স্বার্থনির্ভর থাকবে, নাকি আমরা ক্রমশ ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে চলে যাব?
সপ্তমত: ইতিহাস কি আমরা লিখব তথ্য দিয়ে, নাকি বিজয়ী পক্ষের ভাষ্যে?
ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা:
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ঘটনা হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি শিক্ষা দিয়েছে—
কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়।
আজ যে ক্ষমতায়, কাল সে ক্ষমতার বাইরে যেতে পারে। আজ যে বিরোধী, কাল সে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে। তাই রাষ্ট্রকে কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা দলের সম্পত্তিতে পরিণত করা বিপজ্জনক।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও তাই শুধু তাঁর সমর্থকদের নয়; সমালোচকদেরও আলোচনার বিষয়। তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটিই ইতিহাসের সম্পদ। একইভাবে ২০২৪-এর আন্দোলনের আত্মত্যাগ, মানুষের ক্ষোভ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনও বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ।
কিন্তু ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে পবিত্র বা অভিশপ্ত ঘোষণা করে দিলে ইতিহাসের শিক্ষা নষ্ট হয়।
শেষ প্রশ্নটি তাই শেখ হাসিনাকে নয়—আমাদের, দুই বছর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো, শেখ হাসিনা কি পরাজিত হয়েছেন? নাকি—
বাংলাদেশ কি তার একটি রাজনৈতিক সম্ভাবনা হারিয়েছে?
উত্তর সময় দেবে।
শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের আগস্টে আবার প্রকাশ্যে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসার দাবি জানিয়েছেন; একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও তীব্রভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। কিন্তু একজন ব্যক্তির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে—
গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হলো,
আইনের শাসন কতটা নিরপেক্ষ হলো,
অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল হলো,
তরুণদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ হলো,
এবং আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে রাজনৈতিক সহাবস্থান কতটা শিখলাম।
সুতরাং দুই বছর পর জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্নটি হোক—
“কে পতিত হলো?”—এই প্রশ্নের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, “আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি, যেখানে কোনো নেতার উত্থান বা পতনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাগ্যকে আর বাঁধতে হবে না?”
কারণ শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির ঊর্ধ্বে একটি নামই থাকবে— বাংলাদেশ। তবে এটাও ঠিক, মুক্তিযোদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা অথবা আওয়ামীলীগ, বাংলাদেশেরই আরেক নাম।
ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক
মুলুজ, ফ্রান্স

আপনার মতামত লিখুন