আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল দাবার ছকে কোনো দেশই চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না, বরং স্বার্থের সমীকরণই শেষ কথা বলে—ভূরাজনীতির এই নির্মম সত্যটি তুরস্ক ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসের দিকে তাকালে আরও একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক তুরস্ক প্রায়শই নিজেকে মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকর্তা, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার এবং প্যান-ইসলামিজম বা মুসলিম সংহতির প্রধান প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে ভালোবাসে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে আঙ্কারার ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা মন্থন করলে সেখানে আদর্শের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক ইসলামের একপেশে তোষণ নীতিই বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের বিরোধিতা করা, আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানের বর্বরতাকে আড়াল করার চেষ্টা এবং দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের আইনি বিচার প্রক্রিয়াকে নগ্নভাবে বাধাগ্রস্ত করার তুর্কি অপচেষ্টা—এমন একাধিক বৈরি পদক্ষেপ দেশটির নীতিগত অবস্থানকে কোটি কোটি বাংলাদেশির জাতীয় অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি এ দেশের কোটি মানুষের আত্মত্যাগ, আবেগ এবং রাষ্ট্র গঠনের অটুট ভিত্তি।
১৯৭১ সালের মহাসংকট: তুরস্কের চোখে যখন বাঙালির রক্ত স্রোতের চেয়ে ইসলামাবাদই প্রিয় ছিল
১৯৭১ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মমতম গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের শিকার হচ্ছিল, যখন এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্মলগ্নের লড়াই চলছিল, তখন তুরস্কের তৎকালীন শাসকেরা বাঙালির এই মানবিক ও ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। আঙ্কারার তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে একে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে খাটো করে দেখার ভুল নীতি গ্রহণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তারা জল্লাদ ইয়াহিয়া খানের সরকারের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে প্রকাশ্য ওকালতি করেছিলেন।
এই চরম বিরূপ অবস্থানের কারণেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলেও আঙ্কারা সেই বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সমস্ত বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, জাতীয় স্মৃতির মণিকোঠায় স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্থান অনেক উঁচুতে। তার বিপরীতে তুরস্ক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওআইসি (ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা) শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যখন খোদ পাকিস্তান বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, ঠিক তার পরপরই ১৯৭৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এই দীর্ঘ বিলম্ব স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, আঙ্কারার কাছে সাড়ে সাত কোটি শোষিত বাঙালির জীবন ও স্বাধীনতার চেয়ে শীতল যুদ্ধকালীন সামরিক জোটের অংশীদার এবং মুসলিম বিশ্বের পুরনো মিত্র ইসলামাবাদের সঙ্গে অন্ধ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমনকি ওআইসিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তুরস্ক কোনো অগ্রণী বা ইতিবাচক ভূমিকা রাখেনি, বরং মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর কূটনৈতিক চাপে পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের পরই তারা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করেছিল।
এরদোয়ানের উত্থান ও ‘রাজনৈতিক ইসলাম’: জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ওকালতির নতুন অধ্যায়
বিংশ শতাব্দীর সেই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সমীকরণ পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে এসে তুরস্কের বাংলাদেশ নীতিতে এক নতুন এবং আরও বেশি বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাত ধরে। এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড ঘরানার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনগুলোর প্রতি এক গভীর আদর্শিক সহানুভূতি প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। আর এই তত্ত্বের সূত্র ধরেই আঙ্কারার বিশেষ নজর গিয়ে পড়ে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠন আলবদর, আলশামস বাহিনী যেভাবে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যারে অংশ নিয়েছিল, তা ইতিহাসের এক কালো দলিল।
২০১০-এর দশক থেকে যখন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠনের মাধ্যমে সেই সমস্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বহু প্রতীক্ষিত ও আইনি বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন খোদ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও তাঁর সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর তীব্র ও নগ্ন বিরোধিতা শুরু করেন। জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রাক্কালে তুরস্ক একের পর এক কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালায়, রায় স্থগিতের আহ্বান জানায় এবং এই আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার কুৎসা রটায়। তুরস্কের এই ভূমিকা বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের স্বাধীন বিচারিক সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল ছিল।
সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, মিশর বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক উৎপত্তি ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, তাদের মূল আদর্শিক ভিত্তি—অর্থাৎ ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানানো, ইসলাম ও রাজনীতির মিশ্রণ এবং একটি সুনির্দিষ্ট ক্যাডারভিত্তিক সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গভীর মিল রয়েছে। আবুল আ'লা মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জামায়াতের এই উগ্র রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি এরদোয়ান সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই অন্ধ মোহ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে এক কালো মেঘের ছায়া ফেলে রেখেছিল।
২০২৬-এর নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও আধুনিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ
সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান ২০২৬ সালের বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তুরস্কের এই গোপন ‘জামায়াত প্রীতি’ সম্পূর্ণ মুছে যায়নি বলে মনে করেন অনেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যদিও সরাসরি রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনী হস্তক্ষেপের বিষয়টি সুক্ষ্মভাবে আড়াল করা হয়, তবুও বিভিন্ন স্বাধীন অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, তুরস্কের বেশ কিছু প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্থা পর্দার আড়াল থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় ধরনের প্রোপাগান্ডা চালানো, দলটির আইটি সেলকে শক্তিশালী করা এবং নেপথ্যে গোপন নির্বাচনী তহবিল জোগান দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় জড়িত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় এই দাবিসমূহকে আরও নিরেট প্রমাণ ও নথিপত্রের আলোকে যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনই আঙ্কারার এই দ্বিমুখী নীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তবে ইতিহাসের এই সমস্ত অমীমাংসিত এবং তিক্ত অধ্যায় থাকা সত্ত্বেও, আধুনিক বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ, মানবিক খাত (বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তুরস্কের ভূমিকা) এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্র ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে তুরস্কের তৈরি অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা দুই দেশের সামরিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এখানেই বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাংলাদেশ কীভাবে তুরস্কের সাথে এই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে এবং একই সাথে ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ক্ষত ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করে নিজের জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখবে—তা একটি বড় প্রশ্ন। প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব কোনোদিন ইতিহাসের নির্মম সত্যকে কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তুরস্ককে যদি সত্যিই বাংলাদেশের এক পরম বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পূর্ণ শ্রদ্ধা জানাতে হবে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একপেশে ধর্মীয় কার্ড খেলা বন্ধ করতে হবে। ইতিহাসকে স্বচ্ছ ও সম্মানজনকভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বীকার করার মাধ্যমেই কেবল দুই দেশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের অবসান ঘটানো সম্ভব।

শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল দাবার ছকে কোনো দেশই চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু থাকে না, বরং স্বার্থের সমীকরণই শেষ কথা বলে—ভূরাজনীতির এই নির্মম সত্যটি তুরস্ক ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসের দিকে তাকালে আরও একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক তুরস্ক প্রায়শই নিজেকে মুসলিম বিশ্বের রক্ষাকর্তা, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার এবং প্যান-ইসলামিজম বা মুসলিম সংহতির প্রধান প্রবক্তা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করতে ভালোবাসে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান শক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে আঙ্কারার ঐতিহাসিক সম্পর্কের গভীরতা মন্থন করলে সেখানে আদর্শের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ এবং রাজনৈতিক ইসলামের একপেশে তোষণ নীতিই বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের বিরোধিতা করা, আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানের বর্বরতাকে আড়াল করার চেষ্টা এবং দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের আইনি বিচার প্রক্রিয়াকে নগ্নভাবে বাধাগ্রস্ত করার তুর্কি অপচেষ্টা—এমন একাধিক বৈরি পদক্ষেপ দেশটির নীতিগত অবস্থানকে কোটি কোটি বাংলাদেশির জাতীয় অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি এ দেশের কোটি মানুষের আত্মত্যাগ, আবেগ এবং রাষ্ট্র গঠনের অটুট ভিত্তি।
১৯৭১ সালের মহাসংকট: তুরস্কের চোখে যখন বাঙালির রক্ত স্রোতের চেয়ে ইসলামাবাদই প্রিয় ছিল
১৯৭১ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মমতম গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের শিকার হচ্ছিল, যখন এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্মলগ্নের লড়াই চলছিল, তখন তুরস্কের তৎকালীন শাসকেরা বাঙালির এই মানবিক ও ন্যায্য অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। আঙ্কারার তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে একে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে খাটো করে দেখার ভুল নীতি গ্রহণ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তারা জল্লাদ ইয়াহিয়া খানের সরকারের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার পক্ষে প্রকাশ্য ওকালতি করেছিলেন।
এই চরম বিরূপ অবস্থানের কারণেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলেও আঙ্কারা সেই বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে সমস্ত বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল, জাতীয় স্মৃতির মণিকোঠায় স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্থান অনেক উঁচুতে। তার বিপরীতে তুরস্ক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওআইসি (ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা) শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যখন খোদ পাকিস্তান বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, ঠিক তার পরপরই ১৯৭৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এই দীর্ঘ বিলম্ব স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, আঙ্কারার কাছে সাড়ে সাত কোটি শোষিত বাঙালির জীবন ও স্বাধীনতার চেয়ে শীতল যুদ্ধকালীন সামরিক জোটের অংশীদার এবং মুসলিম বিশ্বের পুরনো মিত্র ইসলামাবাদের সঙ্গে অন্ধ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এমনকি ওআইসিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তুরস্ক কোনো অগ্রণী বা ইতিবাচক ভূমিকা রাখেনি, বরং মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর কূটনৈতিক চাপে পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের পরই তারা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করেছিল।
এরদোয়ানের উত্থান ও ‘রাজনৈতিক ইসলাম’: জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ওকালতির নতুন অধ্যায়
বিংশ শতাব্দীর সেই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সমীকরণ পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীতে এসে তুরস্কের বাংলাদেশ নীতিতে এক নতুন এবং আরও বেশি বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা হয় প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাত ধরে। এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ এবং মুসলিম ব্রাদারহুড ঘরানার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনগুলোর প্রতি এক গভীর আদর্শিক সহানুভূতি প্রকাশ্য রূপ লাভ করে। আর এই তত্ত্বের সূত্র ধরেই আঙ্কারার বিশেষ নজর গিয়ে পড়ে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্র সংগঠন আলবদর, আলশামস বাহিনী যেভাবে পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও গণহত্যারে অংশ নিয়েছিল, তা ইতিহাসের এক কালো দলিল।
২০১০-এর দশক থেকে যখন বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠনের মাধ্যমে সেই সমস্ত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বহু প্রতীক্ষিত ও আইনি বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন খোদ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও তাঁর সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা এর তীব্র ও নগ্ন বিরোধিতা শুরু করেন। জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতার মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রাক্কালে তুরস্ক একের পর এক কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চালায়, রায় স্থগিতের আহ্বান জানায় এবং এই আন্তর্জাতিক মানের বিচার প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার কুৎসা রটায়। তুরস্কের এই ভূমিকা বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের স্বাধীন বিচারিক সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল ছিল।
সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক গবেষকদের মতে, মিশর বা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক উৎপত্তি ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, তাদের মূল আদর্শিক ভিত্তি—অর্থাৎ ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানানো, ইসলাম ও রাজনীতির মিশ্রণ এবং একটি সুনির্দিষ্ট ক্যাডারভিত্তিক সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গভীর মিল রয়েছে। আবুল আ'লা মওদুদীর চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জামায়াতের এই উগ্র রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি এরদোয়ান সরকারের নীতিনির্ধারকদের এই অন্ধ মোহ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে এক কালো মেঘের ছায়া ফেলে রেখেছিল।
২০২৬-এর নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও আধুনিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ
সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান ২০২৬ সালের বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তুরস্কের এই গোপন ‘জামায়াত প্রীতি’ সম্পূর্ণ মুছে যায়নি বলে মনে করেন অনেক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। যদিও সরাসরি রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনী হস্তক্ষেপের বিষয়টি সুক্ষ্মভাবে আড়াল করা হয়, তবুও বিভিন্ন স্বাধীন অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, তুরস্কের বেশ কিছু প্রভাবশালী ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্থা পর্দার আড়াল থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় ধরনের প্রোপাগান্ডা চালানো, দলটির আইটি সেলকে শক্তিশালী করা এবং নেপথ্যে গোপন নির্বাচনী তহবিল জোগান দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর প্রক্রিয়ায় জড়িত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় এই দাবিসমূহকে আরও নিরেট প্রমাণ ও নথিপত্রের আলোকে যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনই আঙ্কারার এই দ্বিমুখী নীতিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তবে ইতিহাসের এই সমস্ত অমীমাংসিত এবং তিক্ত অধ্যায় থাকা সত্ত্বেও, আধুনিক বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ, মানবিক খাত (বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তুরস্কের ভূমিকা) এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্র ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্তমানে তুরস্কের তৈরি অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা দুই দেশের সামরিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এখানেই বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাংলাদেশ কীভাবে তুরস্কের সাথে এই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখবে এবং একই সাথে ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ক্ষত ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস না করে নিজের জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখবে—তা একটি বড় প্রশ্ন। প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব কোনোদিন ইতিহাসের নির্মম সত্যকে কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তুরস্ককে যদি সত্যিই বাংলাদেশের এক পরম বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হতে হয়, তবে তাকে অবশ্যই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পূর্ণ শ্রদ্ধা জানাতে হবে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একপেশে ধর্মীয় কার্ড খেলা বন্ধ করতে হবে। ইতিহাসকে স্বচ্ছ ও সম্মানজনকভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বীকার করার মাধ্যমেই কেবল দুই দেশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের অবসান ঘটানো সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন