মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশের চেনা জগৎটা আচমকা ভীষণ অচেনা আর ভারী হয়ে ওঠে। বুকের ভেতর জমতে থাকে কষ্টের এমন এক কালো মেঘ, যা কাউকে বুঝিয়ে বলা যায় না। কিছু দুঃখ এত গভীর আর একান্ত হয় যে, তা প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা পরম প্রিয় জীবনসঙ্গীকেও সেই কষ্টের কথা বলতে গেলে মনে হয়— 'তারা কি আদৌ আমার ভেতরের এই ক্ষতটা বুঝতে পারবে? নাকি উল্টো উপহাসের পাত্র হব?' মানুষের এই যে নিঃসঙ্গতা, মনের এই যে অবর্ণনীয় ব্যাকুলতা—ইসলাম একেই বলে প্রকৃত ‘দুঃখ’। আর এই দুঃখেরই একমাত্র সার্থক রাজদরবার হলেন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
জগতে মানুষ যখন চরমভাবে ভেঙে পড়ে, তখন সে একজন শ্রোতা খোঁজে। কিন্তু মানুষের স্বভাব হলো, সে অন্যের দুঃখের কথা কিছু সময় শুনলেও একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে যায়। মানুষের কাছে বারবার হাত পাতলে বা নিজের দুর্বলতার কথা প্রকাশ করলে সমাজে সস্তা হয়ে যেতে হয়। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামিন ঠিক এর উল্টো। বান্দা যত বেশি তাঁর কাছে নিজের দুঃখের কথা বলে কেঁদে বুক ভাসায়, তিনি তত বেশি খুশি হন। পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের সেই কঠিন পরীক্ষার কথা স্মরণ করলেই এর সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ মেলে। প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আ.)-কে হারিয়ে যখন তিনি শোকে কাতর, চারপাশের মানুষ যখন তাঁর এই দীর্ঘ কান্নার সমালোচনা করছিল, তখন তিনি এক ঐতিহাসিক ও অমর বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। সূরা ইউসুফের ৮৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই জবানবন্দি তুলে ধরেছেন:
"তিনি (ইয়াকুব) বললেন, ‘আমি তো আমার অসহ্য বেদনা ও দুঃখ কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।’"
এই একটি আয়াতই আমাদের শিখিয়ে দেয়, মুমিনের দুঃখ প্রকাশের আসল ঠিকানা কোথায়। যে কথা পৃথিবীর কাউকেই বলা যায় না, যে কান্না বুকে চেপে রাখলে দম আটকে আসে, সেই কথাগুলো মাঝরাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পরম তৃপ্তিতে আল্লাহকে বলা যায়। যখন পুরো পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ডাকতে থাকেন— 'কার কী কষ্ট আছে আমার কাছে চাও, আমি পূরণ করব।' তাহাজ্জুদের সেই নীরব মুহূর্তটাই হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একান্ত গোপনে দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়। সেখানে কোনো লোকদেখানো লৌকিকতা নেই, নেই কোনো সংকোচ। সেজদায় গিয়ে চোখের পানি ফেললে সেই অশ্রু মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত ও চরমভাবে অপদস্থ হয়েছিলেন, তখন তিনি পাথরের আঘাতে জখম শরীর নিয়ে কোনো মানুষের কাছে নালিশ করেননি। তিনি একাকী হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দুআ করেছিলেন, "হে আল্লাহ! আমি কেবল আপনার কাছেই আমার দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের অভিযোগ করছি..."। দুঃখ যখন মানুষকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করে, তখন সেই দুঃখ আর অভিশাপ থাকে না, তা হয়ে ওঠে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার এক পরম আশীর্বাদ। তাই জীবনে যখন এমন কোনো কষ্টের মুখোমুখি হবেন যা প্রকাশ করা অসম্ভব, তখন হতাশ না হয়ে মুচকি হেসে জায়নামাজটা বিছিয়ে দিন। কারণ যে কথা আল্লাহ ছাড়া কাউকে বলা যায় না, তা শোনার জন্য স্বয়ং আরশের মালিক অধীর অপেক্ষায় থাকেন।
বিষয় : islamic

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশের চেনা জগৎটা আচমকা ভীষণ অচেনা আর ভারী হয়ে ওঠে। বুকের ভেতর জমতে থাকে কষ্টের এমন এক কালো মেঘ, যা কাউকে বুঝিয়ে বলা যায় না। কিছু দুঃখ এত গভীর আর একান্ত হয় যে, তা প্রকাশ করার মতো কোনো ভাষা অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা পরম প্রিয় জীবনসঙ্গীকেও সেই কষ্টের কথা বলতে গেলে মনে হয়— 'তারা কি আদৌ আমার ভেতরের এই ক্ষতটা বুঝতে পারবে? নাকি উল্টো উপহাসের পাত্র হব?' মানুষের এই যে নিঃসঙ্গতা, মনের এই যে অবর্ণনীয় ব্যাকুলতা—ইসলাম একেই বলে প্রকৃত ‘দুঃখ’। আর এই দুঃখেরই একমাত্র সার্থক রাজদরবার হলেন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
জগতে মানুষ যখন চরমভাবে ভেঙে পড়ে, তখন সে একজন শ্রোতা খোঁজে। কিন্তু মানুষের স্বভাব হলো, সে অন্যের দুঃখের কথা কিছু সময় শুনলেও একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে যায়। মানুষের কাছে বারবার হাত পাতলে বা নিজের দুর্বলতার কথা প্রকাশ করলে সমাজে সস্তা হয়ে যেতে হয়। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামিন ঠিক এর উল্টো। বান্দা যত বেশি তাঁর কাছে নিজের দুঃখের কথা বলে কেঁদে বুক ভাসায়, তিনি তত বেশি খুশি হন। পবিত্র কুরআনে হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর জীবনের সেই কঠিন পরীক্ষার কথা স্মরণ করলেই এর সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ মেলে। প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আ.)-কে হারিয়ে যখন তিনি শোকে কাতর, চারপাশের মানুষ যখন তাঁর এই দীর্ঘ কান্নার সমালোচনা করছিল, তখন তিনি এক ঐতিহাসিক ও অমর বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। সূরা ইউসুফের ৮৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সেই জবানবন্দি তুলে ধরেছেন:
"তিনি (ইয়াকুব) বললেন, ‘আমি তো আমার অসহ্য বেদনা ও দুঃখ কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।’"
এই একটি আয়াতই আমাদের শিখিয়ে দেয়, মুমিনের দুঃখ প্রকাশের আসল ঠিকানা কোথায়। যে কথা পৃথিবীর কাউকেই বলা যায় না, যে কান্না বুকে চেপে রাখলে দম আটকে আসে, সেই কথাগুলো মাঝরাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পরম তৃপ্তিতে আল্লাহকে বলা যায়। যখন পুরো পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ডাকতে থাকেন— 'কার কী কষ্ট আছে আমার কাছে চাও, আমি পূরণ করব।' তাহাজ্জুদের সেই নীরব মুহূর্তটাই হলো আল্লাহর সাথে বান্দার একান্ত গোপনে দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়। সেখানে কোনো লোকদেখানো লৌকিকতা নেই, নেই কোনো সংকোচ। সেজদায় গিয়ে চোখের পানি ফেললে সেই অশ্রু মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন তায়েফের ময়দানে রক্তাক্ত ও চরমভাবে অপদস্থ হয়েছিলেন, তখন তিনি পাথরের আঘাতে জখম শরীর নিয়ে কোনো মানুষের কাছে নালিশ করেননি। তিনি একাকী হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দুআ করেছিলেন, "হে আল্লাহ! আমি কেবল আপনার কাছেই আমার দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের অভিযোগ করছি..."। দুঃখ যখন মানুষকে আল্লাহর দিকে ধাবিত করে, তখন সেই দুঃখ আর অভিশাপ থাকে না, তা হয়ে ওঠে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার এক পরম আশীর্বাদ। তাই জীবনে যখন এমন কোনো কষ্টের মুখোমুখি হবেন যা প্রকাশ করা অসম্ভব, তখন হতাশ না হয়ে মুচকি হেসে জায়নামাজটা বিছিয়ে দিন। কারণ যে কথা আল্লাহ ছাড়া কাউকে বলা যায় না, তা শোনার জন্য স্বয়ং আরশের মালিক অধীর অপেক্ষায় থাকেন।

আপনার মতামত লিখুন