ক্ষমতার চার মাসেই ব্যাংক খাত খালি করে ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ নামে দুই হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও হরিলুট!
ঢাকা: চরম অর্থনৈতিক মন্দা, রাজস্ব আদায়ের ভয়াবহ ধস এবং জনগণের ওপর চেপে বসা আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির মাঝেই স্বজনপ্রীতি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও হরিলুটের নতুন এক নজির স্থাপন করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। দেশের ব্যাংক খাত থেকে ক্ষমতার মাত্র সাড়ে চার মাসে রেকর্ড প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করলেও, দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার দোহাই দিয়ে প্রবর্তিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির পেছনেই জনগণের রক্ত পানি করা রাজস্ব থেকে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, দরিদ্র মানুষের পেটে ভাত দেওয়ার আগে কেবল কার্ড প্রস্তুত, বিতর্কিত জরিপ পরিচালনা, প্রশাসনিক সেমিনার এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে নামসর্বস্ব এক বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজনেই সরকারি কোষাগার থেকে শত শত কোটি টাকা পকেটে ভরার সমস্ত বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছে।দেশজুড়ে যখন সাধারণ মানুষ চাল-ডাল ও নিত্যপণ্যের দামের কাছে জিম্মি, ঠিক সেই সময়ে সরকারের ব্যয় কমানোর ফাঁকা বুলির মুখোশ খুলে দিয়েছে এই মেগা-প্রকল্পের খরচ ফাঁপানোর চিত্র। বিভিন্ন নথিপত্র ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে যে, প্রকল্পটির মূল উপকারভোগীদের কাছে প্রত্যক্ষ কোনো আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর আগেই সরকারি কর্মকর্তা, পছন্দের আউটসোর্সিং এজেন্সি ও দলীয় ক্যাডারদের পকেট ভারী করতে থোক বরাদ্দ থেকে অপচয় ও অনিয়মের এক বিশাল পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।বিতরণ অনুষ্ঠানেই ৫০ কোটির অপচয়: ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিকে উপলক্ষ করে কেবল একটি বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজনেই খরচ ধরা হয়েছে অবিশ্বাস্য ৫০ কোটি টাকা! সরকারের এই বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অপচয়ের তীব্র সমালোচনা করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সরাসরি মন্তব্য করেছেন যে, এটি যেন পুরোপুরি ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’।সরকারের আশকারা ও তোঘলকি সিদ্ধান্তের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন তোলেন, “একটি মাত্র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পেছনে ৫০ কোটি টাকা খরচ করা কোনো স্বাভাবিক বা সুস্থ মানসিকতার কাজ হতে পারে না। এই ৫০ কোটি টাকা তো অনেক বিশাল অঙ্কের অর্থ— যা দিয়ে দেশের হাজার হাজার অনাহারী ও প্রকৃত অসচ্ছল পরিবারকে সরাসরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া যেত। প্রচারমুখী ও প্রদর্শনপ্রিয় রাজনৈতিক অনুষ্ঠান আয়োজনেই যদি এত বিপুল পরিমাণের বাজেট উড়ানো হয়, তবে এ জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই তো পুরোপুরি ব্যর্থ ও অর্থহীন হয়ে পড়ে।”যদিও বিতর্ক ঢাকতে প্রকল্প পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন দায়সারা কণ্ঠে সাফাই গেয়ে দাবি করেছেন যে অনুষ্ঠানে খরচের জন্য ৫০ কোটি বরাদ্দ রাখা হলেও পুরোটা নাকি খরচ নাও হতে পারে! তবে সচেতন মহলের মতে, সরকারি বরাদ্দের দোহাই দিয়ে এমন বিপুল অঙ্ক নির্ধারণ মূলত দলীয় সুবিধাভোগীদের পকেট ভরানোরই এক প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত।অভাবী বাদ, কার্ড পাচ্ছে বাড়িওয়ালা: কড়াইল বস্তিতেই স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির মহোৎসব!জনগণের ট্যাক্সের টাকায় হাজার কোটি টাকার এই আয়োজন শুরুতেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির চাদরে ঢাকা পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছিল, সেখানেই দেখা গেছে অসাধুতা ও স্বজনপ্রীতির নগ্ন রূপ। বিশেষ করে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে— যা খোদ প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত এবং যেখানকার নির্বাচনী জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ক্ষমতা পাওয়ার পর প্রথম ফ্যামিলি কার্ডের লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— সেখানেই ঘটেছে সবচেয়ে বড় প্রতারণা।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কড়াইল বস্তির হাজার হাজার ভূমিহীন, গৃহহীন ও প্রকৃত দিনমজুর পরিবারকে তালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে প্রভাবশালী বাড়ির মালিক, সচ্ছল ব্যক্তি এবং স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলীয় ক্যাডারদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে সাহায্যের আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফিরে আসা কড়াইলের অটোরিকশাচালক মো. শান্ত অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সাথে জানান, “আমার অভাবী সংসার কোনো সাহায্য পেল না, কিন্তু আমার বিত্তবান বাড়িওয়ালা অনায়াসে ফ্যামিলি কার্ড পেয়ে গেল! যাদের সত্যিই এই মুহূর্তে পেটের ভাতের জন্য সাহায্য দরকার ছিল, তাদের কপালে কিছুই জোোটেনি। সব দলীয় লোক আর প্রভাবশালীদের মাঝে বাটোয়ারা হয়ে গেছে।”আইন অনুযায়ী স্থানীয় ওয়ার্ড সভার মাধ্যমে প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ তালিকা তৈরির বাধ্যবাধকতা থাকলেও সরকার ও তাদের অনুগত প্রশাসন সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোপন কোঠায় নিজেদের লোকদের সুবিধা দিয়েছে। ফলে 'বৈষম্যহীনতা' ও 'সহায়তার' চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে শুরুতেই চরম দলীয়করণ ও অনিয়মের দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে।জরিপ ও বিলাসী কেনাকাটায় প্রায় ২ হাজার কোটির বাজেট ফানুস!পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘এসএসপিআইআরআইটি’ (SSPIRIT) নামক একটি আগের বিদ্যমান প্রকল্পের ওপর ভর দিয়ে কোনো প্রকার সুনির্দিষ্ট রাজস্ব বাজেট ছাড়াই চটজলদি এই কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে অনুমোদিত মূল ৯০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকার প্রকল্পটিকে রাতারাতি সংশোধিত রূপ দিয়ে এক লাফে বাড়িয়ে ২ হাজার ৮১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা করা হয়েছে! অর্থাৎ কেবল এই রাজনৈতিক কার্ড প্রথার চাটুকারিতার জন্যই বাড়তি প্রায় ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটে এই কর্মসূচির কোনো আনুষ্ঠানিক বাজেট না থাকা সত্ত্বেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ সেলিম হোসেন তড়িঘড়ি করে অর্থ বিভাগ ও ইআরডি-কে চিঠি দিয়ে ১ হাজার ৫১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা থোক বরাদ্দ থেকে অবিলম্বে হস্তান্তরের অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছেন।হিসাবের খাতায় চোখ বুলালেই এই লুটপাটের বাস্তব চিত্র ভেসে ওঠে:স্মার্ট কার্ড তৈরি ও বিতরণ: চলতি বছরে মাত্র ৪১ লাখ মানুষকে কার্ড দিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫০ কোটি ৮২ হাজার টাকা!বিলাসী প্রযুক্তি কেনাকাটা: দেশের তথ্য সংগ্রহের নামে ৬৬ হাজার ৮১৫টি সাধারণ ট্যাব এবং অনাবশ্যকভাবে ৫টি ‘সুপার কম্পিউটার’ কেনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২২১ কোটি ৩২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।জরিপকর্মী ও দলীয় অনুসারীদের বেতন-ভাতা: ৬০ হাজার তথাকথিত জরিপকারী নিয়োগের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের পেছনে রাখা হয়েছে অবিশ্বাস্য ৬৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা!ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ বিলাসীতা: কেবল সেমিনার, কর্মকর্তাদের যাতায়াত টিএ/ডিএ ও প্রশিক্ষণের নামে নিছক টেবিল-টকের পেছনে আরও অতিরিক্ত প্রায় ১৪ কোটি টাকা বাজেটে ঢোকানো হয়েছে।বিলাসী গাড়ি বহর: নতুন করে গাড়ি কেনার ও ভাড়া নেওয়ার নামে দুটি জিপ এবং আটটি নতুন মাইক্রোবাসসহ মোট ১০টি বিলাসবহুল যান ভাড়ায় খাটানোর সরকারি অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।ব্যাংক খালি করে রাজনৈতিক বৈভব প্রদর্শন: চরম সংকটে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাপ্রত্যাশিত আয় বা রাজস্ব সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষমতার মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় বিএনপি সরকার যখন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে রেকর্ড ৬৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে এবং নতুন করে টাকা ছাপিয়ে অর্থনীতিকে এক আশঙ্কাজনক দেউলিয়া পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন দেশের জনগণের ওপর আবার নতুন করে ফ্যামিলি কার্ডের আড়ালে আড়াই হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা চাপানো হচ্ছে।বিশ্লেষকদের মতে, নিম্নবিত্ত মানুষকে সহায়তার নামে এই ফ্যামিলি কার্ড মূলত সরকারি অর্থ তছরুপ, ভুয়া জরিপ খাতের নামে দলীয় ক্যাডারদের ভাতা প্রদান এবং বিতরণী অনুষ্ঠানের মহোৎসবে শত কোটি টাকা আত্মসাতের এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ জনগণের পেটে টান দিয়ে এমন রাজকীয় অপচয় ও লুটপাট দেশের ধসে পড়া অর্থনীতিকে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে ঠেকাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শীর্ষ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।