ঢাকা    শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
Bengali Journal

আন্তর্জাতিক

তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অদক্ষতা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির অশনিসংকেত?

তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অদক্ষতা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির অশনিসংকেত?



রাষ্ট্রের স্বার্থ বনাম দলীয় রাজনীতি

একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই কেবল সরকারের ঘোষিত নীতির নাম নয়। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে, আন্তর্জাতিক সংকটে কী ভাষা ব্যবহার করে এবং অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থকে কীভাবে কূটনীতির সঙ্গে সমন্বয় করে—এসবের সমষ্টিই একটি দেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় নির্মাণ করে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলছে। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই অবস্থান নীতিগতভাবে ইতিবাচক। বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রের জন্যও এমন নীতি প্রয়োজন।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির আসল পরীক্ষা ঘোষণায় নয়—তার বাস্তব প্রয়োগে।


চীনের দিকে দ্রুত অগ্রসরতা

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বেইজিং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যতটা দ্রুত গভীর হচ্ছে, একই সঙ্গে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য কৌশলগত অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের আস্থার সম্পর্কও কি একইভাবে শক্তিশালী হচ্ছে?

কূটনীতির সাফল্য কোনো একটি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় নয়; বরং একাধিক শক্তির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখায়।

বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে এগোচ্ছে—এমন খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক আধুনিকায়ন বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার। কিন্তু প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাবও বিবেচনা করা জরুরি।


ভারত: সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

দুই দেশের সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য শুধু প্রতিবেশী নয়; একটি অপরিহার্য কৌশলগত বাস্তবতা।

কিন্তু শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রত্যর্পণ ইস্যু, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল।

এখানে তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা:

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কি অতীতের রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে এনে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা সম্ভব?

ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে ভারতের প্রতি আনুগত্য নয়। আবার ভারতের বিরোধিতাও জাতীয়তাবাদের প্রমাণ নয়।

পরিণত কূটনীতির ভাষা হলো—

বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়; মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু বৈরিতা নয়।


পাকিস্তান: ইতিহাসকে ভুলে নয়

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন করে উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ।

তাই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় যদি তৈরি হয়, সেটি হতে হবে ইতিহাসের সত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই।

কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা যায়; ইতিহাস পুনর্লিখন করা যায় না।

বাংলাদেশের জন্য এটাই হওয়া উচিত নীতিগত সীমারেখা।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি

নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশ?

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো এবং তাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বাংলাদেশ যদি কোনো নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—দেশটি কি তার ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে?

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই।

বাংলাদেশের উচিত কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের অংশ না হয়ে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

তৈরি পোশাক রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শ্রম অধিকার, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং প্রবাসী শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

তাই চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখাও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের অংশ।

কূটনীতির একটি মৌলিক শিক্ষা হলো:

একটি দরজা খুলতে গিয়ে অন্য দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া কূটনৈতিক সাফল্য নয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন—সব দরজা খোলা রাখা।


৫টি বড় কূটনৈতিক ঝুঁকি

০১ | ভারত:
দ্বিপক্ষীয় অবিশ্বাস দীর্ঘায়িত হলে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি ও নিরাপত্তায় চাপ বাড়তে পারে।

০২ | চীন:
অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নির্ভরতা কৌশলগত ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

০৩ | পাকিস্তান:
সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গিয়ে ১৯৭১-এর ইতিহাস যেন রাজনৈতিক সমঝোতার শিকার না হয়।

০৪ | পশ্চিমা বিশ্ব:
বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

০৫ | সামরিক জোট:
কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক সামরিক বলয়ে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।


আসল প্রশ্নটি কোথায়?

তারেক রহমানের প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘অদক্ষতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়তো অতিসরলীকরণ হবে। কারণ প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত হিসাব থাকতে পারে।

কিন্তু একটি সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা বিচার করতে হলে আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তের চেয়ে সামগ্রিক গতিপথ দেখতে হয়।

চীন, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন দিকে এগোচ্ছে—সেটিই আসল প্রশ্ন।

যদি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।


বাংলাদেশের ভাবমূর্তি—রাষ্ট্রের অদৃশ্য সম্পদ

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়।

একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রভাব ফেলে—

বিনিয়োগে | বাণিজ্যে | শ্রমবাজারে | পর্যটনে | উন্নয়ন সহযোগিতায় | কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারদের আস্থা দুর্বল হতে পারে।

সুতরাং তারেক রহমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠন ও ধরে রাখা।


অশনিসংকেত নাকি নতুন সম্ভাবনা?

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সংকট, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

সাফল্য নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর:

বাংলাদেশ কি ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হবে, নাকি নিজের জন্য একটি স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করবে?

বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো দেশের ছায়া নয়—নিজস্ব কূটনৈতিক পরিচয়।

চীন থাকবে বন্ধু, ভারত থাকবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থাকবে অর্থনৈতিক অংশীদার, মধ্যপ্রাচ্য থাকবে শ্রম ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক।

কিন্তু কোনো সম্পর্কই যেন বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সীমিত না করে।

তারেক রহমানের সামনে তাই ইতিহাসের একটি কঠিন প্রশ্ন:

তিনি কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘কোন দেশের পক্ষে’ থেকে ‘বাংলাদেশের পক্ষে’ নিয়ে যেতে পারবেন?

যদি পারেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় দর্শনে পরিণত হতে পারে।

আর যদি কূটনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবেগ ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠতে পারে।

কারণ রাষ্ট্রনায়কত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু ক্ষমতা অর্জনে নয়।

প্রকৃত পরীক্ষা হলো—ক্ষমতায় থাকার পর একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আস্থা কতটা অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।


ড. আবদুল্লাহ আল আমিন বাবু

কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক
মুলুজ, ফ্রান্স

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অদক্ষতা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির অশনিসংকেত?

প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image




রাষ্ট্রের স্বার্থ বনাম দলীয় রাজনীতি

একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই কেবল সরকারের ঘোষিত নীতির নাম নয়। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব কীভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে, আন্তর্জাতিক সংকটে কী ভাষা ব্যবহার করে এবং অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থকে কীভাবে কূটনীতির সঙ্গে সমন্বয় করে—এসবের সমষ্টিই একটি দেশের আন্তর্জাতিক পরিচয় নির্মাণ করে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলছে। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই অবস্থান নীতিগতভাবে ইতিবাচক। বাংলাদেশের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রের জন্যও এমন নীতি প্রয়োজন।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতির আসল পরীক্ষা ঘোষণায় নয়—তার বাস্তব প্রয়োগে।


চীনের দিকে দ্রুত অগ্রসরতা

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই বেইজিং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা অস্বাভাবিক নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যতটা দ্রুত গভীর হচ্ছে, একই সঙ্গে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য কৌশলগত অংশীদারের সঙ্গে বাংলাদেশের আস্থার সম্পর্কও কি একইভাবে শক্তিশালী হচ্ছে?

কূটনীতির সাফল্য কোনো একটি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় নয়; বরং একাধিক শক্তির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখায়।

বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে J-10CE যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে এগোচ্ছে—এমন খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক আধুনিকায়ন বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার। কিন্তু প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাবও বিবেচনা করা জরুরি।


ভারত: সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

দুই দেশের সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য শুধু প্রতিবেশী নয়; একটি অপরিহার্য কৌশলগত বাস্তবতা।

কিন্তু শেখ হাসিনাকে ঘিরে প্রত্যর্পণ ইস্যু, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল।

এখানে তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা:

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কি অতীতের রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে এনে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা সম্ভব?

ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে ভারতের প্রতি আনুগত্য নয়। আবার ভারতের বিরোধিতাও জাতীয়তাবাদের প্রমাণ নয়।

পরিণত কূটনীতির ভাষা হলো—

বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়; মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু বৈরিতা নয়।


পাকিস্তান: ইতিহাসকে ভুলে নয়

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন করে উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বার্থে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ।

তাই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় যদি তৈরি হয়, সেটি হতে হবে ইতিহাসের সত্য অক্ষুণ্ণ রেখেই।

কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা যায়; ইতিহাস পুনর্লিখন করা যায় না।

বাংলাদেশের জন্য এটাই হওয়া উচিত নীতিগত সীমারেখা।


মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি

নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশ?

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে ঘিরে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো এবং তাতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আগ্রহ ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

বাংলাদেশ যদি কোনো নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—দেশটি কি তার ঐতিহ্যগত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে?

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই।

বাংলাদেশের উচিত কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বলয়ের অংশ না হয়ে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই

বাংলাদেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

তৈরি পোশাক রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শ্রম অধিকার, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং প্রবাসী শ্রমবাজার—সব ক্ষেত্রেই ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

তাই চীন বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখাও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের অংশ।

কূটনীতির একটি মৌলিক শিক্ষা হলো:

একটি দরজা খুলতে গিয়ে অন্য দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া কূটনৈতিক সাফল্য নয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন—সব দরজা খোলা রাখা।


৫টি বড় কূটনৈতিক ঝুঁকি

০১ | ভারত:
দ্বিপক্ষীয় অবিশ্বাস দীর্ঘায়িত হলে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি ও নিরাপত্তায় চাপ বাড়তে পারে।

০২ | চীন:
অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নির্ভরতা কৌশলগত ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।

০৩ | পাকিস্তান:
সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গিয়ে ১৯৭১-এর ইতিহাস যেন রাজনৈতিক সমঝোতার শিকার না হয়।

০৪ | পশ্চিমা বিশ্ব:
বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

০৫ | সামরিক জোট:
কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক সামরিক বলয়ে অতিরিক্ত সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।


আসল প্রশ্নটি কোথায়?

তারেক রহমানের প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘অদক্ষতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়তো অতিসরলীকরণ হবে। কারণ প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত হিসাব থাকতে পারে।

কিন্তু একটি সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা বিচার করতে হলে আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তের চেয়ে সামগ্রিক গতিপথ দেখতে হয়।

চীন, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোন দিকে এগোচ্ছে—সেটিই আসল প্রশ্ন।

যদি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।


বাংলাদেশের ভাবমূর্তি—রাষ্ট্রের অদৃশ্য সম্পদ

আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়।

একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রভাব ফেলে—

বিনিয়োগে | বাণিজ্যে | শ্রমবাজারে | পর্যটনে | উন্নয়ন সহযোগিতায় | কূটনৈতিক দর-কষাকষিতে।

সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আসবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারদের আস্থা দুর্বল হতে পারে।

সুতরাং তারেক রহমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠন ও ধরে রাখা।


অশনিসংকেত নাকি নতুন সম্ভাবনা?

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত সংকট, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আলোচনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনি নতুন ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

সাফল্য নির্ভর করবে একটি প্রশ্নের ওপর:

বাংলাদেশ কি ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হবে, নাকি নিজের জন্য একটি স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান তৈরি করবে?

বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো দেশের ছায়া নয়—নিজস্ব কূটনৈতিক পরিচয়।

চীন থাকবে বন্ধু, ভারত থাকবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থাকবে অর্থনৈতিক অংশীদার, মধ্যপ্রাচ্য থাকবে শ্রম ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক।

কিন্তু কোনো সম্পর্কই যেন বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে সীমিত না করে।

তারেক রহমানের সামনে তাই ইতিহাসের একটি কঠিন প্রশ্ন:

তিনি কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘কোন দেশের পক্ষে’ থেকে ‘বাংলাদেশের পক্ষে’ নিয়ে যেতে পারবেন?

যদি পারেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় দর্শনে পরিণত হতে পারে।

আর যদি কূটনীতি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবেগ ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের কাছে পরাজিত হয়, তাহলে আজকের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠতে পারে।

কারণ রাষ্ট্রনায়কত্বের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু ক্ষমতা অর্জনে নয়।

প্রকৃত পরীক্ষা হলো—ক্ষমতায় থাকার পর একটি রাষ্ট্রের মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক আস্থা কতটা অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।


ড. আবদুল্লাহ আল আমিন বাবু

কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক
মুলুজ, ফ্রান্স


Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অদক্ষতা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির অশনিসংকেত?
0:00 0:00
1.0x