ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
Bengali Journal

মতামত

শেখ হাসিনার বিকল্প কি তিনি নিজেই

শেখ হাসিনার বিকল্প কি তিনি নিজেই

শেখ হাসিনার বিকল্প—তিনি নিজেই?

দক্ষিণ এশিয়ার ‘লৌহমানবী’, ফ্যাসিস্ট নাকি উন্নয়নের অধিনায়ক—একটি জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এমন একটি নাম, যাকে বাদ দিয়ে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা কঠিন। তাঁকে কেউ দেখেন উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অধিনায়ক হিসেবে, কেউ দেখেন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও কর্তৃত্ববাদের প্রতীক হিসেবে। আবার তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের একটি অংশ তাঁকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়েছে।

কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ককে কি কেবল একটি অভিধায় বিচার করা যায়?

শেখ হাসিনা কি শুধু একজন কর্তৃত্ববাদী শাসক, নাকি একই সঙ্গে উন্নয়নের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের নির্মাতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা এক শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়ক?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, ইতিহাস ও বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।

উন্নয়নের বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা:

শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় তাঁর সরকারের সময় ঘটেছে—এটি অস্বীকার করা কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান এবং মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। 

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সংযোগ এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের অংশ হয়ে আছে।

অবশ্য উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার, নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও উঠেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। 

অতএব ইতিহাসের বিচারে দুটি বাস্তবতাকেই পাশাপাশি রাখতে হবে।

উন্নয়নকে অস্বীকার করা যাবে না, আবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নও এড়ানো যাবে না।

পদ্মা সেতু: নির্ভরতার মানসিকতা ভাঙার প্রতীক

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গ আসবেই।

বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ বাতিল করে। বিশ্বব্যাংক সে সময় প্রকল্পে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং তদন্তে বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। 

বাংলাদেশ সরকার অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়াই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু ২০২২ সালে উদ্বোধন হয়। 

এখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

বাংলাদেশ একটি বড় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন-সংকটের পরও প্রকল্পটি নিজের অর্থে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছিল।

শেখ হাসিনার সমর্থকেরা এটিকে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেন।

সমালোচকেরা আবার পদ্মা প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেন।

সুতরাং পদ্মা সেতুর ইতিহাসকে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ বলে সরলীকরণ যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়।

পদ্মা সেতু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ওয়াশিংটনের চাপ ও ঢাকার অবস্থান:

শেখ হাসিনার শেষ সময়ের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি আলোচিত দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করে। নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িত বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসা-নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয় সেই নীতিতে। 

ঢাকার অবস্থান ছিল—বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিদেশি চাপ গ্রহণযোগ্য নয়। সে সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও মার্কিন ভিসা-নীতির প্রভাব নিয়ে প্রকাশ্যে বলেন, বাংলাদেশ নিজের নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম। 

এখানে মতপার্থক্য থাকতে পারে।

এক পক্ষের কাছে এটি ছিল সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় অবস্থান।

অন্য পক্ষের কাছে এটি ছিল আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চাপকে প্রত্যাখ্যান।

কিন্তু এটুকু বলা যায়—শেখ হাসিনা সরকার আন্তর্জাতিক চাপকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিল এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছিল।

বিদেশি কূটনীতিকদের ‘নাক না গলানোর’ বার্তা:

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের প্রকাশ্য মন্তব্যও তখন বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার বিদেশি কূটনীতিকদের কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্য মন্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানায়। 

এখানেও দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা সম্ভব।

সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ চাইবে না—এটি স্বাভাবিক।

আবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়ও হতে পারে।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকেই নিতে হবে।

এই অবস্থানই তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে ‘লৌহমানবী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ফিলিস্তিনের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান:

ফিলিস্তিন প্রশ্নেও শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবস্থান বজায় রাখে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনা গাজায় যুদ্ধ ও বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানান এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে সমর্থন করেন। তিনি দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথাও বলেন। 

এটি শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অবস্থান ছিল না; বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—বাংলাদেশের ফিলিস্তিন-সমর্থন কোনো একক সরকারের সৃষ্টি নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ।

তবু শেখ হাসিনা সরকারের সময় এই অবস্থানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমানভাবে পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।

তাহলে কি তিনি ‘লৌহমানবী’?:

একজন নেতার রাজনৈতিক শক্তি শুধু তিনি কত বছর ক্ষমতায় ছিলেন তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

দেখতে হয়—

কতটা চাপের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন।

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন সংকটের পর নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা-নীতির চাপের মুখে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা, বিদেশি কূটনীতিকদের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান বজায় রাখা—এসব তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হতে পারে।

কিন্তু এখানেই ভারসাম্যের প্রশ্নটি জরুরি।

আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা কোনো নেতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক প্রমাণ করে না।

একইভাবে উন্নয়নও রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে না।

২০২৪: যে বছর সব হিসাব বদলে গেল

তারপর এলো ২০২৪।

সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরণমুখী করে তোলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধানে আন্দোলন দমনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে। 

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান।

একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের অবসান ঘটে।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই শুরু—

পতনের পর বাংলাদেশ কোথায় গেল?:

পতনের পর কি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ?

অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়।

সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন—সবকিছুকে নতুনভাবে সাজানোর কথা বলা হয়।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—

ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলেছে কি না!

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ হয় যে ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, তাহলে তাঁর পতনের পর কি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়েছে?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ব্যক্তি পরিবর্তন হয়েছে—রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়।

এ কারণেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শেখ হাসিনা নন।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা।

শেখ হাসিনাকে কি শুধু ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেই ইতিহাস শেষ?

শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ।

কিন্তু ইতিহাসের বিচারে কোনো অভিধাই যথেষ্ট নয়।

তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানও সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। এসবের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না।

একজন নেতার সাফল্য তাঁর ব্যর্থতাকে মুছে দেয় না; আবার তাঁর ব্যর্থতাও তাঁর সব সাফল্যকে মুছে দিতে পারে না। এটাই ইতিহাসের নিরপেক্ষতা।

শেখ হাসিনার বিকল্প—তিনি নিজেই?:

এখানে এসে শিরোনামের প্রশ্নটি ফিরে আসে।

শেখ হাসিনার বিকল্প কি আরেকজন শক্তিশালী নেতা? আরেকটি রাজনৈতিক দল? আরেকটি জোট? নাকি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান? আমার উত্তর—

শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো ব্যক্তি হওয়া উচিত নয়।

বিকল্প হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে—

নির্বাচন হবে অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক;

বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন; সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করতে পারবে; বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের শত্রু মনে করা হবে না; সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষ নিরাপদ থাকবে; এবং কোনো রাজনৈতিক নেতা নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করতে পারবেন না। 

আজকের বাংলাদেশ এবং আগামী দিনের প্রশ্ন:

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজিয়েছে।

আজকের বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তি উঠে এসেছে। পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি সংকুচিত হয়েছে। রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কিন্তু পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশের জনগণ আর কোনো ‘লৌহমানব’ বা ‘লৌহমানবী’র ওপর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল মনে করবে না।

কারণ—

 একজন শক্তিশালী নেতা একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন;

কিন্তু একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই একটি দেশকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু প্রশংসা বা নিন্দার বিষয় নয়।

এটি বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষাও।

তিনি উন্নয়নের কিছু বড় অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক। তিনি একই সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও গণতান্ত্রিক সংকটের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই তিনটি সত্যকে একসঙ্গে ধারণ করেই তাঁর ইতিহাস লিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই থেকে যায়—

শেখ হাসিনা কি বাংলাদেশের সমস্যা ছিলেন, নাকি বাংলাদেশের একটি যুগের অপরিহার্য রাজনৈতিক চরিত্র?

তিনি কি দক্ষিণ এশিয়ার লৌহমানবী, উন্নয়নের অধিনায়ক, কর্তৃত্ববাদী শাসক—নাকি একই সঙ্গে এসব পরিচয়ের জটিল সমন্বয়? আর তাঁর পতনের পর আমরা কি সত্যিই তাঁর বিকল্প তৈরি করেছি, নাকি শুধু তাঁর জায়গায় নতুন কোনো ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরির অপেক্ষায় আছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ নয়, আগামী দিনের ইতিহাস দেবে।

ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন

কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬


শেখ হাসিনার বিকল্প কি তিনি নিজেই

প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

শেখ হাসিনার বিকল্প—তিনি নিজেই?

দক্ষিণ এশিয়ার ‘লৌহমানবী’, ফ্যাসিস্ট নাকি উন্নয়নের অধিনায়ক—একটি জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা এমন একটি নাম, যাকে বাদ দিয়ে গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা কঠিন। তাঁকে কেউ দেখেন উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অধিনায়ক হিসেবে, কেউ দেখেন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও কর্তৃত্ববাদের প্রতীক হিসেবে। আবার তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের একটি অংশ তাঁকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়েছে।

কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ককে কি কেবল একটি অভিধায় বিচার করা যায়?

শেখ হাসিনা কি শুধু একজন কর্তৃত্ববাদী শাসক, নাকি একই সঙ্গে উন্নয়নের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের নির্মাতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা এক শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়ক?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, ইতিহাস ও বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।

উন্নয়নের বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা:

শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় তাঁর সরকারের সময় ঘটেছে—এটি অস্বীকার করা কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, শিক্ষা, জীবনযাত্রার মান এবং মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। 

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ, ডিজিটাল সংযোগ এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের অংশ হয়ে আছে।

অবশ্য উন্নয়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার, নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও উঠেছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের অনুসন্ধানেও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। 

অতএব ইতিহাসের বিচারে দুটি বাস্তবতাকেই পাশাপাশি রাখতে হবে।

উন্নয়নকে অস্বীকার করা যাবে না, আবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নও এড়ানো যাবে না।

পদ্মা সেতু: নির্ভরতার মানসিকতা ভাঙার প্রতীক

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গ আসবেই।

বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ বাতিল করে। বিশ্বব্যাংক সে সময় প্রকল্পে উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং তদন্তে বাংলাদেশের পদক্ষেপ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। 

বাংলাদেশ সরকার অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়াই প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু ২০২২ সালে উদ্বোধন হয়। 

এখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

বাংলাদেশ একটি বড় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন-সংকটের পরও প্রকল্পটি নিজের অর্থে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছিল।

শেখ হাসিনার সমর্থকেরা এটিকে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা ও সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেন।

সমালোচকেরা আবার পদ্মা প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেন।

সুতরাং পদ্মা সেতুর ইতিহাসকে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ বলে সরলীকরণ যেমন ঠিক নয়, তেমনি এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অস্বীকার করাও বাস্তবসম্মত নয়।

পদ্মা সেতু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ওয়াশিংটনের চাপ ও ঢাকার অবস্থান:

শেখ হাসিনার শেষ সময়ের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি আলোচিত দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করে। নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িত বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসা-নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয় সেই নীতিতে। 

ঢাকার অবস্থান ছিল—বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিদেশি চাপ গ্রহণযোগ্য নয়। সে সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও মার্কিন ভিসা-নীতির প্রভাব নিয়ে প্রকাশ্যে বলেন, বাংলাদেশ নিজের নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম। 

এখানে মতপার্থক্য থাকতে পারে।

এক পক্ষের কাছে এটি ছিল সার্বভৌমত্ব রক্ষার দৃঢ় অবস্থান।

অন্য পক্ষের কাছে এটি ছিল আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চাপকে প্রত্যাখ্যান।

কিন্তু এটুকু বলা যায়—শেখ হাসিনা সরকার আন্তর্জাতিক চাপকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিল এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছিল।

বিদেশি কূটনীতিকদের ‘নাক না গলানোর’ বার্তা:

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকদের প্রকাশ্য মন্তব্যও তখন বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার বিদেশি কূটনীতিকদের কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্য মন্তব্যের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানায়। 

এখানেও দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা সম্ভব।

সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ চাইবে না—এটি স্বাভাবিক।

আবার গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়ও হতে পারে।

কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকেই নিতে হবে।

এই অবস্থানই তাঁর সমর্থকদের কাছে তাঁকে ‘লৌহমানবী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ফিলিস্তিনের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান:

ফিলিস্তিন প্রশ্নেও শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবস্থান বজায় রাখে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনা গাজায় যুদ্ধ ও বেসামরিক মানুষের হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানান এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারকে সমর্থন করেন। তিনি দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথাও বলেন। 

এটি শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত অবস্থান ছিল না; বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও তা সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—বাংলাদেশের ফিলিস্তিন-সমর্থন কোনো একক সরকারের সৃষ্টি নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘ ঐতিহ্যের অংশ।

তবু শেখ হাসিনা সরকারের সময় এই অবস্থানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃশ্যমানভাবে পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।

তাহলে কি তিনি ‘লৌহমানবী’?:

একজন নেতার রাজনৈতিক শক্তি শুধু তিনি কত বছর ক্ষমতায় ছিলেন তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

দেখতে হয়—

কতটা চাপের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন।

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন সংকটের পর নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা-নীতির চাপের মুখে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা, বিদেশি কূটনীতিকদের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান বজায় রাখা—এসব তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হতে পারে।

কিন্তু এখানেই ভারসাম্যের প্রশ্নটি জরুরি।

আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা কোনো নেতাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক প্রমাণ করে না।

একইভাবে উন্নয়নও রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে অপ্রাসঙ্গিক করে না।

২০২৪: যে বছর সব হিসাব বদলে গেল

তারপর এলো ২০২৪।

সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরণমুখী করে তোলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধানে আন্দোলন দমনে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে। 

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান।

একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের অবসান ঘটে।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই শুরু—

পতনের পর বাংলাদেশ কোথায় গেল?:

পতনের পর কি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ?

অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়।

সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন—সবকিছুকে নতুনভাবে সাজানোর কথা বলা হয়।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—

ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলেছে কি না!

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ হয় যে ক্ষমতা অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, তাহলে তাঁর পতনের পর কি প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়েছে?

যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে ব্যক্তি পরিবর্তন হয়েছে—রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়।

এ কারণেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শেখ হাসিনা নন।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা।

শেখ হাসিনাকে কি শুধু ‘ফ্যাসিস্ট’ বললেই ইতিহাস শেষ?

শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানের একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ।

কিন্তু ইতিহাসের বিচারে কোনো অভিধাই যথেষ্ট নয়।

তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানও সাবেক সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। এসবের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না।

একজন নেতার সাফল্য তাঁর ব্যর্থতাকে মুছে দেয় না; আবার তাঁর ব্যর্থতাও তাঁর সব সাফল্যকে মুছে দিতে পারে না। এটাই ইতিহাসের নিরপেক্ষতা।

শেখ হাসিনার বিকল্প—তিনি নিজেই?:

এখানে এসে শিরোনামের প্রশ্নটি ফিরে আসে।

শেখ হাসিনার বিকল্প কি আরেকজন শক্তিশালী নেতা? আরেকটি রাজনৈতিক দল? আরেকটি জোট? নাকি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান? আমার উত্তর—

শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো ব্যক্তি হওয়া উচিত নয়।

বিকল্প হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে—

নির্বাচন হবে অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক;

বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন; সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করতে পারবে; বিরোধী দলকে রাষ্ট্রের শত্রু মনে করা হবে না; সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষ নিরাপদ থাকবে; এবং কোনো রাজনৈতিক নেতা নিজেকে রাষ্ট্রের সমার্থক মনে করতে পারবেন না। 

আজকের বাংলাদেশ এবং আগামী দিনের প্রশ্ন:

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে সম্পূর্ণ নতুন করে সাজিয়েছে।

আজকের বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তি উঠে এসেছে। পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি সংকুচিত হয়েছে। রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কিন্তু পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশের জনগণ আর কোনো ‘লৌহমানব’ বা ‘লৌহমানবী’র ওপর রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল মনে করবে না।

কারণ—

 একজন শক্তিশালী নেতা একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন;

কিন্তু একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই একটি দেশকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবন তাই শুধু প্রশংসা বা নিন্দার বিষয় নয়।

এটি বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষাও।

তিনি উন্নয়নের কিছু বড় অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক। তিনি একই সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও গণতান্ত্রিক সংকটের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই তিনটি সত্যকে একসঙ্গে ধারণ করেই তাঁর ইতিহাস লিখতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই থেকে যায়—

শেখ হাসিনা কি বাংলাদেশের সমস্যা ছিলেন, নাকি বাংলাদেশের একটি যুগের অপরিহার্য রাজনৈতিক চরিত্র?

তিনি কি দক্ষিণ এশিয়ার লৌহমানবী, উন্নয়নের অধিনায়ক, কর্তৃত্ববাদী শাসক—নাকি একই সঙ্গে এসব পরিচয়ের জটিল সমন্বয়? আর তাঁর পতনের পর আমরা কি সত্যিই তাঁর বিকল্প তৈরি করেছি, নাকি শুধু তাঁর জায়গায় নতুন কোনো ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরির অপেক্ষায় আছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ নয়, আগামী দিনের ইতিহাস দেবে।

ড. বাবু আব্দুল্লাহ আল আমীন

কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক



Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
শেখ হাসিনার বিকল্প কি তিনি নিজেই
0:00 0:00
1.0x