ঢাকা    শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
Bengali Journal

কৃষকের জানালা

সোনালী আঁশ এখন সোনালী অতীত

সোনালী আঁশ এখন সোনালী অতীত
বাড়ির মহিলারা উৎপাদিত পাট শুকাতে দিচ্ছেন

একসময় উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের মাঠের পর মাঠ ছেয়ে থাকত সবুজ পাটের গাছে। কৃষকের ঘরে উঠত সোনালী আঁশ, আর পাটকে ঘিরে জমে উঠত জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। চলতি মৌসুমে জেলার পাট চাষে নেমেছে নজিরবিহীন ধস। কৃষকের অনাগ্রহ, সময়মতো বৃষ্টির অভাব, পাট পচানোর পানির সংকট এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে কম দাম—সব মিলিয়ে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লালমনিরহাট জেলা কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে জেলায় পাট চাষ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর। এর বিপরীতে চাষ হয়েছিল ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০ বেল পাট।

পরের মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে পাট চাষের জমি কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ হেক্টরে। একই সঙ্গে উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ বেলে।

চলতি ২০২৪-২৫ মৌসুমে কৃষি বিভাগ প্রায় ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে চাষ হয়েছে ৩০০ হেক্টরেরও কম জমিতে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি জেলার পাট চাষের সর্বনিম্ন চিত্র।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাট চাষে অনাগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। ডিজেল, সার, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

অন্যদিকে উৎপাদন শেষে বাজারে পাটের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। অথচ প্রতি মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে পাট চাষ করে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।

পাট চাষ কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ পানি সংকট। সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক এলাকায় পাট চাষ ব্যাহত হয়েছে। চাষের পর পাট কাটলেও তা পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় পাট জাগ দেওয়ার সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে অনেক কৃষককে দূরবর্তী এলাকায় নিয়ে গিয়ে পাট পচাতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে শ্রম ও পরিবহন খরচ, কমছে লাভের পরিমাণ।

হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫৫) বলেন, “গত বছর দুই বিঘা জমিত পাট খাড়িসিনু (চাষ করেছিলাম)। পাট পচাবার মতো কোনো পানি পাও নাই। শেষত দূরে নিয়া যাইয়া জাগ দেওয়া লাগছে। বিক্রি করিয়া খোরচা (খরচ)-ই উঠে নাই। তাই এবা আর পাটের দিকে যাই নাই, ওটে ভুট্টা আর ধান নাগাইছি।”

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাটের তুলনায় ভুট্টা, ধান ও বিভিন্ন সবজি চাষে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি ও ঝামেলা কম। বিশেষ করে পাট পচানোর জন্য পানির ব্যবস্থা করতে না হওয়ায় অনেক কৃষক বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

ফলে প্রতিবছর পাট চাষের জমি কমার পাশাপাশি জেলার কৃষি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। পাটের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমও ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পাট পচানোর জলাশয়ের ঘাটতির কারণে কৃষকরা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। পাটের পরিবর্তে ভুট্টা ও সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

তিনি বলেন, “আমরা আধুনিক রিবন রেটিং (ফিতা ফানেল) পদ্ধতিতে পাট পচানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পাশাপাশি কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি, যাতে সোনালী আঁশের ঐতিহ্য লালমনিরহাট থেকে হারিয়ে না যায়।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাট চাষ টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারিভাবে পাট ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা, পাট পচানোর জন্য পর্যাপ্ত জলাশয়ের ব্যবস্থা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ জরুরি।

তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একসময় যে লালমনিরহাটের মাঠ সোনালী আঁশে ভরে উঠত, সেই জেলার মানচিত্র থেকেই পাট চাষ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হারিয়ে যেতে পারে পাটকে ঘিরে গড়ে ওঠা জেলার কৃষি ও অর্থনৈতিক ঐতিহ্যও।

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬


সোনালী আঁশ এখন সোনালী অতীত

প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬

featured Image

একসময় উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের মাঠের পর মাঠ ছেয়ে থাকত সবুজ পাটের গাছে। কৃষকের ঘরে উঠত সোনালী আঁশ, আর পাটকে ঘিরে জমে উঠত জেলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। চলতি মৌসুমে জেলার পাট চাষে নেমেছে নজিরবিহীন ধস। কৃষকের অনাগ্রহ, সময়মতো বৃষ্টির অভাব, পাট পচানোর পানির সংকট এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে কম দাম—সব মিলিয়ে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লালমনিরহাট জেলা কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে জেলায় পাট চাষ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর। এর বিপরীতে চাষ হয়েছিল ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০ বেল পাট।

পরের মৌসুমে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে পাট চাষের জমি কমে দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ হেক্টরে। একই সঙ্গে উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ বেলে।

চলতি ২০২৪-২৫ মৌসুমে কৃষি বিভাগ প্রায় ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে চাষ হয়েছে ৩০০ হেক্টরেরও কম জমিতে। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি জেলার পাট চাষের সর্বনিম্ন চিত্র।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাট চাষে অনাগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া। ডিজেল, সার, কীটনাশক ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

অন্যদিকে উৎপাদন শেষে বাজারে পাটের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লাভ তো দূরের কথা, অনেক কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। অথচ প্রতি মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে পাট চাষ করে কৃষকের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি।

পাট চাষ কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ পানি সংকট। সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় অনেক এলাকায় পাট চাষ ব্যাহত হয়েছে। চাষের পর পাট কাটলেও তা পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় পাট জাগ দেওয়ার সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে অনেক কৃষককে দূরবর্তী এলাকায় নিয়ে গিয়ে পাট পচাতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে শ্রম ও পরিবহন খরচ, কমছে লাভের পরিমাণ।

হাতীবান্ধা উপজেলার কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫৫) বলেন, “গত বছর দুই বিঘা জমিত পাট খাড়িসিনু (চাষ করেছিলাম)। পাট পচাবার মতো কোনো পানি পাও নাই। শেষত দূরে নিয়া যাইয়া জাগ দেওয়া লাগছে। বিক্রি করিয়া খোরচা (খরচ)-ই উঠে নাই। তাই এবা আর পাটের দিকে যাই নাই, ওটে ভুট্টা আর ধান নাগাইছি।”

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাটের তুলনায় ভুট্টা, ধান ও বিভিন্ন সবজি চাষে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি ও ঝামেলা কম। বিশেষ করে পাট পচানোর জন্য পানির ব্যবস্থা করতে না হওয়ায় অনেক কৃষক বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

ফলে প্রতিবছর পাট চাষের জমি কমার পাশাপাশি জেলার কৃষি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। পাটের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমও ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পাট পচানোর জলাশয়ের ঘাটতির কারণে কৃষকরা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। পাটের পরিবর্তে ভুট্টা ও সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।

তিনি বলেন, “আমরা আধুনিক রিবন রেটিং (ফিতা ফানেল) পদ্ধতিতে পাট পচানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। পাশাপাশি কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি, যাতে সোনালী আঁশের ঐতিহ্য লালমনিরহাট থেকে হারিয়ে না যায়।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাট চাষ টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারিভাবে পাট ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা, পাট পচানোর জন্য পর্যাপ্ত জলাশয়ের ব্যবস্থা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে পাট পচানোর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ জরুরি।

তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে একসময় যে লালমনিরহাটের মাঠ সোনালী আঁশে ভরে উঠত, সেই জেলার মানচিত্র থেকেই পাট চাষ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। হারিয়ে যেতে পারে পাটকে ঘিরে গড়ে ওঠা জেলার কৃষি ও অর্থনৈতিক ঐতিহ্যও।


Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
সোনালী আঁশ এখন সোনালী অতীত
0:00 0:00
1.0x