ঢাকা    শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
Bengali Journal

অপরাধ

জেন-জি’র অজানা ইতিহাস:

টানবাজার পতিতালয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ছাত্রদল সভাপতি, অতঃপর সাড়ে তিন ডজন মামলার জাকির খানের ‘জননেতা’ বনে যাওয়ার ইতিহাস।

টানবাজার পতিতালয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ছাত্রদল সভাপতি, অতঃপর সাড়ে তিন ডজন মামলার জাকির খানের ‘জননেতা’ বনে যাওয়ার ইতিহাস।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় অপরাধ, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রের মহড়া আর ক্ষমতার পালাবদলের এক চরম অবিশ্বাস্য ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের নাম নারায়ণগঞ্জের জাকির খান। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেশের আলোচিত সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় জাকির খানসহ সব আসামিকে আদালত খালাস দেওয়ার পর, গত ১৩ এপ্রিল তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে রাজকীয় মুক্ত আলোয় ফিরে আসেন; যার ফলে এক সময়ের এই দুর্ধর্ষ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিটি রাতারাতি ‘নিপীড়িত জননেতা’র তকমা পেয়ে যান, যা নতুন প্রজন্মের তথা জেন-জি’র কাছে এক মস্ত বড় ধাঁধা। অথচ ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ২০০২ সালের ২৩ আগস্ট শুক্রবার ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়কে যানজটে আটকে পড়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর জাকির খানের গাড়িবহর থেকে নির্বিচারে চালানো এলোপাতাড়ি গুলিতে ৮ জন গুলিবিদ্ধসহ ২০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। এর পরপরই ২০০২ সালের ২৫ আগস্ট দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো ‘কে এই জাকির খান’ শিরোনামে এক বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দেশবাসী প্রথম জানতে পারে—কোনো সুনির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র না হয়েও কেবল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি নাসিরউদ্দিন পিন্টুর হাত ধরে ১৯৯৯ সালে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি বনে যাওয়া জাকির খানের মূল পেশা ছিল চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি। স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক অলিন্দের খবর অনুযায়ী, তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী টানবাজার পতিতালয়ের গডফাদার হিসেবে পরিচিত দৌলত খানের ছেলে জাকির খান ১৯৮৯ সালে জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা নাসিম ওসমানের হাত ধরে ছাত্রসমাজে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ওসমানের সাথে বিরোধের জেরে ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৫ সালে দেওভোগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের পেছনে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে নিজের দুর্ধর্ষ পরিচিতি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

রাজনীতির চোরাবালিতে জাকির খানের এই উত্থান ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা; ১৯৯৬ সালে খাজা সুপার মার্কেট ভাঙচুরের মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেলেও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা ও রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার মাত্র ৭ মাসের মাথায় চাঁদাবাজির মামলায় পুনরায় ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করার পর, ১৯৯৯ সালে জেল থেকে বের হয়েই তিনি অলৌকিকভাবে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির শীর্ষ পদটি বাগিয়ে নেন। ২০০০ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে টানবাজার ও নিমতলী পতিতালয় উচ্ছেদ হলে জাকির পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায় বলে সেসময় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রচার পায়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলায় বাংলাদেশ নিটওয়‍্যার অ্যান্ড ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA) -এর প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও সাবেক সহ-সভাপতি সাব্বির আলম খন্দকার মাসদাইর এলাকায় আততায়ীদের গুলিতে নিহত হলে, সেই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি হিসেবে নাম আসায় জাকির খান দেশ ছেড়ে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যান এবং সেখানে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে 'গ্রেস' নামে একটি থ্রি-স্টার হোটেল কিনে ব্যবসা শুরু করেন। সাব্বির আলমের ভাই ও জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি তৈমুর আলম খন্দকার প্রথমে তৎকালীন বিএনপি দলীয় এমপি গিয়াসউদ্দিনকে প্রধান আসামি করে মামলা করলেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমীকরণ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের গোপন শর্ত সাপেক্ষে গিয়াসউদ্দিনের নাম নারাজি পিটিশন থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ৪টি হত্যা মামলাসহ সাড়ে তিন ডজনেরও বেশি মামলার আসামি জাকির খানকে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বিএনপির একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ গ্রুপ তৈমুর আলমের কাউন্টারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের গোপন চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। দীর্ঘ দুই দশক পর আদালতের খালাসের রায় ও কারাগার থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের মাঠের রাজনীতিতে জাকির খানের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন আগামী দিনের স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই ও অপরাধ জগতের সমীকরণকে কোন ভয়ঙ্কর দিকে নিয়ে যায়—তা নিয়ে জেলার সচেতন মহলের মাঝে এখন তীব্র ধোঁয়াশা ও আশঙ্কার জন্ম হয়েছে। বেঙ্গলি জার্নালের বিশেষ জাতীয়, রাজনৈতিক ও ক্রাইম অনুসন্ধানী উইং নারায়ণগঞ্জের জাকির খানের মুক্তি-পরবর্তী রাজনৈতিক তৎপরতা, মাঠপর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ওলট-পালট হওয়া আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটি খবরাখবর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিমুহূর্তে অনুসন্ধান করছে।

বিষয় : নারায়ণগঞ্জ জাকির খান ছাত্রদল

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬


টানবাজার পতিতালয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ছাত্রদল সভাপতি, অতঃপর সাড়ে তিন ডজন মামলার জাকির খানের ‘জননেতা’ বনে যাওয়ার ইতিহাস।

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় অপরাধ, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রের মহড়া আর ক্ষমতার পালাবদলের এক চরম অবিশ্বাস্য ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের নাম নারায়ণগঞ্জের জাকির খান। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে দেশের আলোচিত সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় জাকির খানসহ সব আসামিকে আদালত খালাস দেওয়ার পর, গত ১৩ এপ্রিল তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে রাজকীয় মুক্ত আলোয় ফিরে আসেন; যার ফলে এক সময়ের এই দুর্ধর্ষ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিটি রাতারাতি ‘নিপীড়িত জননেতা’র তকমা পেয়ে যান, যা নতুন প্রজন্মের তথা জেন-জি’র কাছে এক মস্ত বড় ধাঁধা। অথচ ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ২০০২ সালের ২৩ আগস্ট শুক্রবার ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়কে যানজটে আটকে পড়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর জাকির খানের গাড়িবহর থেকে নির্বিচারে চালানো এলোপাতাড়ি গুলিতে ৮ জন গুলিবিদ্ধসহ ২০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। এর পরপরই ২০০২ সালের ২৫ আগস্ট দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো ‘কে এই জাকির খান’ শিরোনামে এক বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দেশবাসী প্রথম জানতে পারে—কোনো সুনির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র না হয়েও কেবল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি নাসিরউদ্দিন পিন্টুর হাত ধরে ১৯৯৯ সালে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি বনে যাওয়া জাকির খানের মূল পেশা ছিল চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি। স্থানীয় সূত্র ও রাজনৈতিক অলিন্দের খবর অনুযায়ী, তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী টানবাজার পতিতালয়ের গডফাদার হিসেবে পরিচিত দৌলত খানের ছেলে জাকির খান ১৯৮৯ সালে জাতীয় পার্টির প্রভাবশালী নেতা নাসিম ওসমানের হাত ধরে ছাত্রসমাজে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ওসমানের সাথে বিরোধের জেরে ১৯৯৪ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৫ সালে দেওভোগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দয়াল মাসুদকে শহরের সোনার বাংলা মার্কেটের পেছনে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করে নিজের দুর্ধর্ষ পরিচিতি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

রাজনীতির চোরাবালিতে জাকির খানের এই উত্থান ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা; ১৯৯৬ সালে খাজা সুপার মার্কেট ভাঙচুরের মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেলেও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠতা ও রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার মাত্র ৭ মাসের মাথায় চাঁদাবাজির মামলায় পুনরায় ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করার পর, ১৯৯৯ সালে জেল থেকে বের হয়েই তিনি অলৌকিকভাবে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির শীর্ষ পদটি বাগিয়ে নেন। ২০০০ সালে নারায়ণগঞ্জ থেকে টানবাজার ও নিমতলী পতিতালয় উচ্ছেদ হলে জাকির পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায় বলে সেসময় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রচার পায়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলায় বাংলাদেশ নিটওয়‍্যার অ্যান্ড ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA) -এর প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও সাবেক সহ-সভাপতি সাব্বির আলম খন্দকার মাসদাইর এলাকায় আততায়ীদের গুলিতে নিহত হলে, সেই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি হিসেবে নাম আসায় জাকির খান দেশ ছেড়ে থাইল্যান্ডে পালিয়ে যান এবং সেখানে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে 'গ্রেস' নামে একটি থ্রি-স্টার হোটেল কিনে ব্যবসা শুরু করেন। সাব্বির আলমের ভাই ও জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি তৈমুর আলম খন্দকার প্রথমে তৎকালীন বিএনপি দলীয় এমপি গিয়াসউদ্দিনকে প্রধান আসামি করে মামলা করলেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমীকরণ ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের গোপন শর্ত সাপেক্ষে গিয়াসউদ্দিনের নাম নারাজি পিটিশন থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ৪টি হত্যা মামলাসহ সাড়ে তিন ডজনেরও বেশি মামলার আসামি জাকির খানকে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বিএনপির একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ গ্রুপ তৈমুর আলমের কাউন্টারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের গোপন চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। দীর্ঘ দুই দশক পর আদালতের খালাসের রায় ও কারাগার থেকে মুক্তির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের মাঠের রাজনীতিতে জাকির খানের এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন আগামী দিনের স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই ও অপরাধ জগতের সমীকরণকে কোন ভয়ঙ্কর দিকে নিয়ে যায়—তা নিয়ে জেলার সচেতন মহলের মাঝে এখন তীব্র ধোঁয়াশা ও আশঙ্কার জন্ম হয়েছে। বেঙ্গলি জার্নালের বিশেষ জাতীয়, রাজনৈতিক ও ক্রাইম অনুসন্ধানী উইং নারায়ণগঞ্জের জাকির খানের মুক্তি-পরবর্তী রাজনৈতিক তৎপরতা, মাঠপর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ওলট-পালট হওয়া আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রতিটি খবরাখবর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিমুহূর্তে অনুসন্ধান করছে।


Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
টানবাজার পতিতালয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ছাত্রদল সভাপতি, অতঃপর সাড়ে তিন ডজন মামলার জাকির খানের ‘জননেতা’ বনে যাওয়ার ইতিহাস।
0:00 0:00
1.0x