Bengali Journal

জাতীয়

অনিয়মে জর্জরিত ‘ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স’, ঝুঁকিতে ব্যান্ডউইথ নিরাপত্তা

প্রকাশ : ০২ মে ২০২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
অনিয়মে জর্জরিত ‘ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স’, ঝুঁকিতে ব্যান্ডউইথ নিরাপত্তা

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মকানুন উপেক্ষা করে একে একে আইআইজি, আইটিসি, আইজিডব্লিউসহ ইন্টারনেট-টেলিকম খাতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স দখলে নেয় আওয়ামী সুবিধাভোগী এ প্রতিষ্ঠান। এসব লাইসেন্স অর্জনে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি), দেশের অভ্যন্তরের আইটিসি প্রতিষ্ঠান এবং এয়ারটেল ও টাটার মতো শীর্ষ ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ওয়ান এশিয়ার মোট বকেয়ার পরিমাণ ২৩ কোটি টাকারও বেশি। বিটিআরসির কাছেই এর বকেয়া প্রায় ৪ কোটি টাকা। বিএসসিসিএল-এর কাছে রয়েছে আরও ১ কোটি টাকার বেশি। অপরদিকে টেলিকম জায়ান্ট এয়ারটেল তাদের ১৩ কোটি টাকার এবং টাটা ৫ কোটি টাকার বকেয়া দাবি করছে। এদিকে বকেয়া আদায়ে নানাভাবে চেষ্টা করে না পেয়ে ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স-এর বিরুদ্ধে বিএসসিপিএলসি ঢাকা জেলা জজ আদালতে ‘আরবিট্রেশন মামলা’ দায়ের করে। এর রায়ে তারা জয়ী হয়। সেই রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি ‘অ্যাওয়ার্ড এক্সিকিউশন মামলা’ করে, যা এখনো চলমান রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, যেন লাইসেন্স বাতিল না হয় এবং তাদের ব্যবসা চালু রাখা যায়। ইতোমধ্যে নিয়মবহির্ভূতভাবে তারা এনওসিও নিয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসির একটি সূত্র।

ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স একসময় আইআইজি, আইটিসি ও আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নিয়ে টেলিকম বাজারে প্রবেশ করলেও সময়ের সঙ্গে শর্ত লঙ্ঘন করে একাধিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। তাদের মালিকানাধীন বেঙ্গল ব্রডব্যান্ড ২০১৬ সালে ডিভিশনাল আইএসপি লাইসেন্স পেলেও নবায়ন না করেই বর্তমানে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এর মালিকানাধীন প্রিজমা ডিজিটাল নেটওয়ার্কের রয়েছে ন্যাশন ওয়াইড আইএসপি লাইসেন্স।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বারবার মোবালইল ফোনে কল, হোয়াটসঅ্যাপ ও এসএমএসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় ওয়ান এশিয়া অ্যালায়ন্সের মূল প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসফারিয়া খায়েরের সঙ্গে। তবে তিনি সাড়া দেননি। পরে পুনরায় চেষ্টা করলে দেখা যায়, তিনি প্রতিবেদকের নম্বরই ব্লক করে দিয়েছেন।

বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্সকে মোট বকেয়ার ৫০ শতাংশ এককালীন পরিশোধ এবং বাকি অংশ কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে এনওসি প্রদান করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পরিশোধের কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত মাত্র ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বলে তিনি জানান।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সভাপতি ইমদাদুল হক বলেন, আইএসপি সেক্টরের সেবাদান নির্ভর করে আইআইজি ও ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারীদের ওপর। কেউ যদি কোটি টাকা বকেয়া রেখে অনিয়ম করে, তা গ্রাহকের নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের জন্য হুমকি। তবে নেপথ্যে যদি নীতিগত বা কাঠামোগত কোনো সমস্যা থাকে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ম ও নীতিমালার আলোকে পর্যালোচনা জরুরি। এক্ষেত্রে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বকেয়া বা নীতিগত ব্যত্যয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান হওয়া উচিত। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন তাগাদা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি পাওনা পরিশোধ করেনি, চিঠির জবাবও দেয়নি। এখন তাদের কাউকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মামলা করেছি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব যুগান্তরকে বলেন, আমরা চাই, ব্যবসায়ীরা স্বচ্ছন্দে ব্যবসা করুক, গ্রাহকদের সেবা দিক। কিন্তু সরকারের পাওনা পরিশোধ না করে কেউ যদি অনিয়মে জড়ায়, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

Bengali Journal

রোববার, ১৪ জুন ২০২৬


অনিয়মে জর্জরিত ‘ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স’, ঝুঁকিতে ব্যান্ডউইথ নিরাপত্তা

প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৫

featured Image

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মকানুন উপেক্ষা করে একে একে আইআইজি, আইটিসি, আইজিডব্লিউসহ ইন্টারনেট-টেলিকম খাতের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স দখলে নেয় আওয়ামী সুবিধাভোগী এ প্রতিষ্ঠান। এসব লাইসেন্স অর্জনে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি), দেশের অভ্যন্তরের আইটিসি প্রতিষ্ঠান এবং এয়ারটেল ও টাটার মতো শীর্ষ ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ওয়ান এশিয়ার মোট বকেয়ার পরিমাণ ২৩ কোটি টাকারও বেশি। বিটিআরসির কাছেই এর বকেয়া প্রায় ৪ কোটি টাকা। বিএসসিসিএল-এর কাছে রয়েছে আরও ১ কোটি টাকার বেশি। অপরদিকে টেলিকম জায়ান্ট এয়ারটেল তাদের ১৩ কোটি টাকার এবং টাটা ৫ কোটি টাকার বকেয়া দাবি করছে। এদিকে বকেয়া আদায়ে নানাভাবে চেষ্টা করে না পেয়ে ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স-এর বিরুদ্ধে বিএসসিপিএলসি ঢাকা জেলা জজ আদালতে ‘আরবিট্রেশন মামলা’ দায়ের করে। এর রায়ে তারা জয়ী হয়। সেই রায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি ‘অ্যাওয়ার্ড এক্সিকিউশন মামলা’ করে, যা এখনো চলমান রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, যেন লাইসেন্স বাতিল না হয় এবং তাদের ব্যবসা চালু রাখা যায়। ইতোমধ্যে নিয়মবহির্ভূতভাবে তারা এনওসিও নিয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসির একটি সূত্র।

ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স একসময় আইআইজি, আইটিসি ও আইজিডব্লিউ লাইসেন্স নিয়ে টেলিকম বাজারে প্রবেশ করলেও সময়ের সঙ্গে শর্ত লঙ্ঘন করে একাধিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। তাদের মালিকানাধীন বেঙ্গল ব্রডব্যান্ড ২০১৬ সালে ডিভিশনাল আইএসপি লাইসেন্স পেলেও নবায়ন না করেই বর্তমানে অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি এর মালিকানাধীন প্রিজমা ডিজিটাল নেটওয়ার্কের রয়েছে ন্যাশন ওয়াইড আইএসপি লাইসেন্স।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বারবার মোবালইল ফোনে কল, হোয়াটসঅ্যাপ ও এসএমএসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় ওয়ান এশিয়া অ্যালায়ন্সের মূল প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসফারিয়া খায়েরের সঙ্গে। তবে তিনি সাড়া দেননি। পরে পুনরায় চেষ্টা করলে দেখা যায়, তিনি প্রতিবেদকের নম্বরই ব্লক করে দিয়েছেন।

বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্সকে মোট বকেয়ার ৫০ শতাংশ এককালীন পরিশোধ এবং বাকি অংশ কিস্তিতে পরিশোধের শর্তে এনওসি প্রদান করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পরিশোধের কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত মাত্র ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বলে তিনি জানান।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সভাপতি ইমদাদুল হক বলেন, আইএসপি সেক্টরের সেবাদান নির্ভর করে আইআইজি ও ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারীদের ওপর। কেউ যদি কোটি টাকা বকেয়া রেখে অনিয়ম করে, তা গ্রাহকের নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের জন্য হুমকি। তবে নেপথ্যে যদি নীতিগত বা কাঠামোগত কোনো সমস্যা থাকে, সেটাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ম ও নীতিমালার আলোকে পর্যালোচনা জরুরি। এক্ষেত্রে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বকেয়া বা নীতিগত ব্যত্যয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তা ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান হওয়া উচিত। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন তাগাদা দিলেও প্রতিষ্ঠানটি পাওনা পরিশোধ করেনি, চিঠির জবাবও দেয়নি। এখন তাদের কাউকে খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মামলা করেছি।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব যুগান্তরকে বলেন, আমরা চাই, ব্যবসায়ীরা স্বচ্ছন্দে ব্যবসা করুক, গ্রাহকদের সেবা দিক। কিন্তু সরকারের পাওনা পরিশোধ না করে কেউ যদি অনিয়মে জড়ায়, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।


Bengali Journal

প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
Copyright © 2026 Bengali Journal
অনিয়মে জর্জরিত ‘ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স’, ঝুঁকিতে ব্যান্ডউইথ নিরাপত্তা
0:00 0:00
1.0x