প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ জুন ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
বাকশাল গঠন: প্রেক্ষাপট, বিতর্ক ও বাস্তবতা
আদর বিশ্বাস , লেখক ও বিশ্লেষক ||
বাকশালের গঠনতন্ত্র :১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করেন। বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে তিনি একটি একক জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন যদিও বাকশাল ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার ১৭ দিন আগেই তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বাকশাল অজুহাত ছিল, তার অনেক আগেই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা চলছিল।২৫ জানুয়ারি, ১৯৭৫ তিনি প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করেন, আর বাকশাল কায়েম হতো ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ সালে৷ কিন্তু তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা আরও কয়েক মাস আগে থেকে। তাঁকে ও তার পরিবারের সদস্যদেরকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের ঢাল হিসেবে বাকশালের প্রসঙ্গ এনে অপপ্রচার চালায় স্বাধীনতাবিরোধী ও মুজিববিরোধীরা। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করা একজন নেতার হঠাৎ গণতন্ত্র থেকে সরে যাওয়ার এই আকস্মিক পরিবর্তন - এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়: কেন তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে সরে এলেন?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে তার সময়কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে হবে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সেদিন জাতীয় সংসদে দেওয়া সেই ভাষণে তিনি বলেন :“আমরা শোষিতের গণতন্ত্র চাই। যারা রাতের অন্ধকারে পয়সা লুট করে, যারা বড় বড় অর্থশালী লোক, যারা বিদেশ থেকে ভোট কেনার জন্য পয়সা পায় তাদের গণতন্ত্র নয়—শোষিতের গণতন্ত্র। এটা আজকের কথা নয়, বহুদিনের কথা আমাদের এবং সে জন্যই আজকে আমাদের শাসনতন্ত্র পরিবর্তন করতে হয়েছে।”অর্থাৎ শোষিত মানুষের প্রকৃত গণতন্ত্রই তার লক্ষ্য—সেই গণতন্ত্র, যেখানে রাতের অন্ধকারে লুটপাটকারীরা বা অর্থবিত্তশালী প্রভাবশালীরা বিদেশি অর্থে ভোট কেনাবেচা করতে পারে না। তার ভাষায়, এ ধরনের প্রভাবিত ব্যবস্থা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়; এটি শোষণের আরেক রূপ। তাই দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই শাসনব্যবস্থার রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।তৎকালীন সংসদে আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ৩১৫ জন সদস্যের মধ্যে ৩০৭ জনই আওয়ামী লীগের- বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিকে একত্রিত করে একটি জাতীয় ঐক্য গঠনের চেষ্টা করা হয়। সংখ্যার জোরে নয়, বরং একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় শক্তিই দেশকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। বাস্তবতা ছিল জটিল। প্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের একটি অংশ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল, যা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি উপলব্ধি করেন, প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। ফলে নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, যারই প্রতিফলন বাকশাল গঠন।দীর্ঘদিন রাজনৈতিক জীবনের গণতান্ত্রিক চেতনাকে কবর দিয়ে তিনি একক দল গঠন করলেন কেন? দেশপ্রেমিক শক্তির জাতীয় ঐক্যের দিকে তার নজর ছিল এবং আওয়ামী লীগের একাংশের ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং নতুন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি মনে করেছিলেন। তাই তো তিনি বলেছিলেন :“বহু দুঃখ নিয়ে এ কাজ করতে হয়েছে। বহুদিন পর্যন্ত বিবেকের দংশনে জ্বলেছি। মাথা নত করি নাই কোনো অন্যায়ের কাছে। আপোষ করি নাই কোনো অন্যায়ের কাছে। জীবনভর সংগ্রাম করেছি। আর এই দুঃখী মানুষ যে রক্ত দিয়েছে, স্বাধীনতা এনেছে, তাদের রক্তে বিদেশ থেকে খাবার আনব সেই খাবার চুরি করে খাবে, অর্থ আনব চুরি করে খাবে, টাকা আনব তা বিদেশে চালান দেবে। বাংলার মাটি থেকে এদের উৎখাত করতে হবে।”অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু নিজেই স্বীকার করেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না; বরং তা ছিল কঠিন ও বেদনাদায়ক। তবুও তিনি দৃঢ় ছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল লুটেরা বা দুর্নীতিবাজদের হাতে যেতে দেওয়া যায় না। যারা দেশের সম্পদ লুট করে, বিদেশে পাচার করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই সময়ের দাবি। সেই লক্ষ্যেই তিনি নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পথে এগিয়েছিলেন। এই রূপান্তর তাই কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং ছিল এক সংকটময় সময়ে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের একটি ব্যতিক্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রয়াস যা আজও ইতিহাসের আলোচনা ও সমালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
প্রধান নির্বাহী পরিচালকঃ সাব্বির আহমেদ সায়েম।
ইমেইলঃ bengalijournal.editor@gmail.com
Copyright © 2026 Bengali Journal